প্রবন্ধ

মহিমার অবসান: নজরুল ইসলাম ও আধুনিক বাংলা কবিতা

Spread the love

প্রস্তাবনা

১. ‘খুনিয়ারা ইসলাম’ বা খেলাফত আন্দোলনের প্রতিনিধি

কাজী আবদুল ওদুদ একদা—সেই ১৯৪২ সালে—লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলা দেশে এক শ্রেণীর সাহিত্যরসিক আছেন যাঁরা নজরুল ইসলামকে জ্ঞান করেন একজন যুগ-প্রবর্তক কবি। আজকার দিনে তাঁদের সংখ্যা-শক্তি কেমন জানি না, তবে নজরুল ইসলামের প্রতি তাঁদের কারো কারো অন্তরের গভীর অনুরাগের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। তাঁদের প্রতিপাদ্যের প্রধান অবলম্বন এই “বিদ্রোহী”। তাঁদের ধারণা, এমন একটা ওজস্বিতা নজরুলের এই “বিদ্রোহী” কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে যা বাংলা সাহিত্যে সম্পূর্ণ নতুন—বাংলার দার্শনিক আবহাওয়ায় এ চিন্তালেশহীন ভাস্বর-ললাট চির-তারুণ্য, এই দ্বিধাহীন দুর্মদ তারুণ্যই নজরুল-প্রতিভার চিরগৌরবময় দান’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৮২)।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আবদুল ওদুদ এই দাবি নাকচ করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহার মতে, ‘যাঁদের এই মত, মনে হয় না নজরুলের এই তারুণ্য বাস্তবিকই তাঁরা বুঝতে চেষ্টা করেছেন।’ আবদুল ওদুদের ধারণা, নজরুল ইসলাম কোন নতুন যুগের সূচনা করেন নাই। কারণ—এক নম্বরে— ‘রবীন্দ্রনাথের “বলাকা”র যুগে নজরুল প্রতিভার উন্মেষ।’ আবদুল ওদুদ যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা এখনও আমাদের হাসির না হইলেও কৌতুহলের উদ্রেক করে। তাঁহার আরও কিছু কথা উদ্ধার না করিয়া পারিতেছি না এখানে। আবদুল ওদুদের স্মৃতিকথা অনুসারে:

“আমরা“আমরা চলি সমুখ পানে
কে আমাদের বাঁধবে,
রইল যারা পিছুর টানে
কাঁদ্বে তারা কাঁদ্বে

অথবা 

    ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে অবুঝ, ওরে সবুজ
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা

অথবা

   শিকল দেবীর ঐ যে পূজা-বেদী
চিরকাল কি রইবে খাড়া,
পাগলামি তুই আয় রে দুয়ার ভেদি’।
ঝড়ের মাতন বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আন্ রে বাছা বাছা
আয় প্রমত্ত, আয় রে আমার কাঁচা

ইত্যাদি ছত্র সে-যুগের বাংলার শিক্ষিত তরুণ-সমাজে উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল—এক হিসাবে বাংলার তরুণ-আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়েছিল এই ‘বলাকা’ কাব্যের সাহায্যে” (ওদুদ ১৩৫৮: ৮২-৮৩)।

সবিনয় নিবেদন করা চলে, নজরুল ইসলামের যুগে কবিতার সমস্যাটি ঠিক কি দাঁড়াইয়াছিল তাহা কাজী আবদুল ওদুদ ধরিতেই পারেন নাই। তিনি প্রবাদপ্রতিম দন কিহোতের মতন অতীত বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছিলেন মাত্র। ‘বলাকা’ আর ‘বিদ্রোহী’—কম করিয়া বলিলেও বলিতে হইবে—ঠিক এক পদার্থ ছিল না। কাজী আবদুল ওদুদের দ্বিতীয় যুক্তিটি ছিল আরও আগ্রাসী। তিনি ধরিয়া লইয়াছিলেন, নজরুল ইসলাম যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার ‘সাহিত্যিক মর্যাদা’ ধর্তব্যের মধ্যেই পড়িবে না।

এই দ্বিতীয় বিচারের প্রতিধ্বনি আমরা পরকালের আরো অনেক লেখকের মধ্যে পাইব—বুদ্ধদেব বসুকে এই শোরগোলের মধ্যেও খানিক আলাদা ধরিয়া চেনা যায়। আবদুল ওদুদের একটি প্রস্তাবের পুনরুক্তি করিতেও বুদ্ধদেব বসু একদা কসুর করেন নাই। ওদুদ লিখিয়াছিলেন, ‘দ্বিতীয়ত, নজরুলের লেখনীতে যে-তারুণ্য রূপ পেয়েছে তার সাহিত্যিক মর্যাদা কেমন সেটিও একটি বড় অনুধাবনের বিষয়। একটু মনোযোগী হলেই চোখে পড়ে, নজরুলের রচনা, বিশেষ করে তাঁর “বিদ্রোহী” যুগের রচনা, অনবদ্য নয়। শ্রেষ্ঠ কবিদের বিশেষ বিশেষ কবিতায় কবি-কল্পনার যে পূর্ণাঙ্গতা প্রকাশ পায় নজরুলের রচনায় সেটির অভাব মাঝে মাঝে প্রায় বেদনাদায়ক হয়েছে। নজরুল যে পূর্ণাঙ্গ কবিতার রচয়িতা তেমন নন, তাঁর কবি-প্রতিভা বরং প্রকাশ পেয়েছে উৎকৃষ্ট চরণের রচনায়, এ উক্তি করা যেতে পারে’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৮৩)।

শুদ্ধমাত্র এই প্রবাদপ্রতিম প্রবচনটি রচনা করিয়াই কাজী আবদুল ওদুদ অবসর গ্রহণ করেন নাই। কাজী নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে তিনি আরও একটা বিচারও রাষ্ট্র করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন, “বিদ্রোহী”-যুগ নজরুলের জন্য জনপ্রিয়তা আনলেও তাঁর কাব্য-সাধনা ব্যাপক সার্থকতা লাভ করেছে তাঁর গানে, এ বিষয়ে বাংলার কাব্যরসিকরা বোধ হয় একমত। রেখাপাতের যে অপরিচ্ছন্নতা “বিদ্রোহী” যুগের অনেক রচনায় লক্ষ্য করা গেছে, তা যে “গানে”র যুগে প্রায় অন্তর্হিত হয়েছে, শুধু অনবদ্য চরণ নয় অনবদ্য কবিতা তাঁর কলম থেকে উৎরেছে, তা মিথ্যা নয়’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৮৮)।

মাত্র এইটুকু বলিয়াই আবদুল ওদুদ তৃপ্ত হন নাই। তিনি একটা ভবিষ্যদ্বাণী পর্যন্ত করিয়াছিলেন। নজরুল ইসলামের ‘কবি-জীবনের অবসান ঘটাও বিচিত্র নয়’ বলিয়া একটা আশংকা তিনি নিজের অজ্ঞানলোক হইতে বাহির করিয়াছিলেন। একথা সত্য যে নজরুল ইসলাম ঠিক নিজের আখেরটা গোছাইতে পারেন নাই। তাঁহার আখের অগোছালোই থাকিয়া গিয়াছিল। আবদুল ওদুদের জবানিতেই না হয় বলি: ‘তবে তাঁর আধুনিক জীবনের পরিণতি কোথায়, বলা সোজা নয়। এর ফলে তাঁর কবি-জীবনের অবসান ঘটাও বিচিত্র নয়—যে তাত্তি¡কতা তাঁর জীবনের মর্মমূলে আমরা দেখেছি তাই হয়ত জয়ী হবে পূর্ণভাবে। অথবা, এর ফলে সমৃদ্ধতর চিত্ত ও তীক্ষ্নতর দৃষ্টি নিয়ে তিনি নতুন করে জীবনে ও সাহিত্যে প্রবেশ করতে পারেন’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৯০)।

আবদুল ওদুদের সিদ্ধান্তটা বড়ই শোচনীয় ছিল। তাঁহার মতে, নজরুল ইসলামের ‘সাহিত্যিক মর্যাদা’ ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না, তবে তাঁহার একটা ‘ঐতিহাসিক মর্যাদা’ সহজেই চোখে পড়ে। ‘সাহিত্যিক মর্যাদা’ না থাকিলেও ‘ঐতিহাসিক মর্যাদা’ থাকিবে কিভাবে? রহস্যের সমাধানটা তিনি বাতলাইলেন: ‘জনজাগরণের দিক’ হইতে আসে এই মর্যাদা। নজরুল ইসলাম সম্পর্কে আবদুল ওদুদের শেষ প্রতিপাদ্য গোটা দুইটি প্রস্তাবে বিবৃত হইয়াছে। এক নম্বরে তিনি সত্য সত্যই ধরিতে পারিয়াছেন: ‘নজরুল এ-যুগের বাঙালী জাতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানত জড়তার বিরুদ্ধে বারবার সংগ্রাম ঘোষণা করে’ ও ‘নির্যাতিত জনসাধারণের পক্ষ সমর্থন করে’; আর ‘মুসলমান-সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তাদের মনে নব নব আশা-উদ্দীপনার সঞ্চার করে, বিশেষ করে বাংলার বা ভারতের আবহমান প্রাণধারার সঙ্গে তাদের প্রেমের নিবিড় যোগ স্থাপন করবার আহবান জানিয়ে’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৯০)।

আবদুল ওদুদের দ্বিতীয় প্রস্তাবটা আরও মজার: ‘সেই প্রেমের সাধনাই মুখ্যত নজরুলের সাধনা হয়েছে। দেশ ও জাতির প্রতি সেই প্রেমে, সেই পূর্ণ আত্মনিবেদনে নজরুল এ-কালে মুসলমানদের মধ্যে, অথবা হিন্দু-মুসলমান সবার মধ্যে, এক সম্মানিত ব্যক্তি—যে বৃহৎজীবনের অথবা জাতীয় জীবনের চেতনা দেশে অনুভূত হয়েছে তাতে তাঁরও প্রতিভার স্পর্শ লেগেছে। এই জনজাগরণের দিক দিয়ে দেখলে সহজেই চোখে পড়ে নজরুলের ঐতিহাসিক মর্যাদা কত বড়’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৯০-৯১)।

‘ঐতিহাসিক মর্যাদা’ বলিতে কাজী আবদুল ওদুদ সত্য সত্য কি বুঝাইলেন তাহা কিছু পরিমাণে অপরিচ্ছন্নই রহিয়া গিয়াছে। তবে তাঁহার লেখায় যে অসামান্য রাখডাক তাহা অনাবৃত করিলে মোটা দাগে কয়েকটা প্রস্তাব আলাদা করা যাইতে পারে। প্রথমেই তিনি মনোযোগ দিয়াছিলেন নজরুল ইসলামের মনোবিশ্লেষণে। সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত নজরুল ইসলাম ছিলেন ‘একজন অসাধারণ ভাববিলাসী ও অভিমানী’— ‘ব্যর্থপ্রেমের বেদনায় গভীরভাবে আহত’—কবিবিশেষ যিনি অবলম্বন করিয়াছিলেন ‘এক দায়িত্বহীন ভবঘুরের জীবন’। আবদুল ওদুদের জবানিতেই শুনি: ‘“বিদ্রোহী” থেকে তাঁর মানসজীবনের গতি যে-মুখী হলো তার সঙ্গে তাঁর পূর্বের ভাব-জীবনের সঙ্গতি অসঙ্গতি দুইই রয়েছে। তাঁর এই যুগের একটি বিশিষ্ট রচনা তাঁর ‘বাঁধন-হারা’ পত্রোপন্যাস। এতে কবি যে তার তরুণ জীবন কিছু পরিমাণে চিত্রিত করেছেন, অনেকে বোধ হয় তা জানেন। এই রচনায় দেখা যাচ্ছে—কবি একজন অসাধারণ ভাববিলাসী ও অভিমানী, ব্যর্থপ্রেমের বেদনায় গভীরভাবে আহত। কিন্তু এই আঘাত যত বড়ই হোক এতে মুহ্যমান তিনি হননি। এই নিষ্করুণ আঘাতে তাঁর অন্তর থেকে উৎসারিত হয়েছে একটি মধু-স্রোতে; কিন্তু এতে লাঞ্ছিত এমন কি ম্রিয়মানও তিনি হননি। তবে তিনি অবলম্বন করেছেন এক দায়িত্বহীন ভবঘুরের জীবন—সেই দায়িত্বহীনতায় তাঁর সুনিবিড় আনন্দ’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৮০)।

আবদুল ওদুদ হয়তো নিজের অজান্তে একমুখে দুই কথাই কহিয়াছিলেন। উপরের মুখটি ছাড়াও তিনি আরেক মুখে কহিয়াছেন, ‘“বিদ্রোহী” প্রকাশের পূর্বেই তাঁর নবীনতা অথবা উদ্দামতা আর ছন্দ-সামর্থ্যরে প্রতি বাংলার সাহিত্যিকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।’ স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিতে পারে—কি কারণে? আবদুল ওদুদ কবুল করিয়াছেন, ‘সাহিত্য-ক্ষেত্রে তাঁর প্রবেশ আর “বিদ্রোহী” রচনা এর মধ্যে কালের ব্যবধান সামান্য—বোধ হয় দুই বৎসরের বেশী নয়।’ ওদুদের চোখে পড়িয়াছে, নজরুল ইসলাম গড়িয়া উঠিতেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ছায়ায়, সত্যেন্দ্রনাথের হাওয়ায়, আর ‘ইরানী—কবিতিলক’ হাফিজের প্রেমে উন্মাদ অবস্থায়। তাঁহার কথায়, ‘আর এক শ্রেণীর ভাবুকদের প্রতিও কবির গভীর শ্রদ্ধা ছিল—তাঁরা বাংলার সন্ত্রাসবাদীর দল’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৮০-৮১)।

এত কিছুর মধ্যে বসিয়াও তিনি কি করিয়া ‘ঐতিহাসিক মর্যাদা’ লাভের যোগ্য হইয়া উঠিলেন তাহা কিন্তু ওদুদ বিশদ করেন নাই। এতক্ষণে আবদুল ওদুদ বিষাদে মজিয়া ইঙ্গিত করিলেন: ‘“বিদ্রোহী” প্রকাশের পূর্বেই “শাতিল আরব” “মোর্হরম” “কোরবাণী” প্রভৃতি যে-সব জনপ্রিয় কবিতা তিনি লিখেছিলেন সে-সবে ব্যক্ত হয়েছিল মুসলমানসমাজের গতানুগতিক জীবনের প্রতি ধিক্কার, এক বলিষ্ঠ নব জীবনারম্ভের জন্য তীব্র কামনা, আর অস্ত্রশস্ত্রের শক্তি ও মহিমায় তাঁর প্রত্যয়। একটি ছিল ভারতীয় মুসলমানদের জন্য খেলাফত যুগ।’

এই খেলাফত যুগটা যে কোন পদার্থ তাহা আবদুল ওদুদ নির্দেশ করিয়াছিলেন এইভাবে, ‘স্বদেশী আন্দোলনে বাংলার হিন্দুর যে সাফল্য মুখ্যত তাইই প্রেরণা জুগিয়েছিল মুসলমানের এই খেলাফত আন্দোলনে। কিন্তু হিন্দুর আয়োজনের ব্যাপকতা তাঁদের ছিল না, ফলে সফলতা তাঁদের জন্য হচ্ছিল সুদূরপরাহত। তাঁদের কেবল লাভ হচ্ছিল দিগ্‌দেশবিহীন এক বিক্ষুব্ধ মানসিকতা। তরুণ নজরুল অর্থাৎ ‘বিদ্রোহী’ রচনার পূর্বের নজরুল, এক হিসাবে ছিলেন এই খেলাফত-যুগের প্রতিনিধিস্থানীয় কবি। তাঁর ‘মোর্হরম’ কবিতার অধুনা-পরিত্যক্ত শেষ দুটি চরণ এই সম্পর্কে স্মরণ করা যেতে পারে—

দুনিয়াতে দুর্মদ খুনিয়ারা ইসলাম—
লহু লাও, নাহি চাই নিষ্কাম বিশ্রাম।

কিন্তু ‘বিদ্রোহী’তে তাঁর মানসিক কুয়াশা এতখানি কেটে যায় যে, তিনি যেন এক নতুন জীবন নিয়ে জেগে ওঠেন, নিজেকে ও জগৎকে দেখ্তে আরম্ভ করেন এক নতুন দৃষ্টিতে’ (ওদুদ ১৩৫৮: ৮১-৮২)।

২. ‘আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তি’ অথবা অসহযোগ আন্দোলনের কবি

প্রায় একই সময়ে হুমায়ুন কবিরও দেখি প্রায় একই মত প্রচার করিতেছিলেন। ইঁহার মতানুসারে, নজরুল ইসলাম ছিলেন—শেষ বিচারে—অসহযোগ আন্দোলনের কবি। তাঁহার প্রতিষ্ঠার সহিত অসহযোগ আন্দোলনের যোগাযোগটা প্রায় প্রত্যক্ষ। হুমায়ুন কবির লিখিতেছেন: ‘তবু রবীন্দ্রনাথ অসহযোগ আন্দোলনের কবি নন, এবং কেন নন তারও কারণ আমরা অন্যত্র আলোচনা করেছি। অসহযোগ আন্দোলনের আলোড়ন বাঙলা কাব্যে বোধ হয় নজরুল ইসলামের মধ্যেই সবচেয়ে বেশী জেগেছিল, এবং সেইজন্যই বর্ত্তমান শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তাঁর এত প্রতিষ্ঠা। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির প্রসঙ্গেও ব্যক্তিগত প্রতিভার বিচার অবান্তর, কারণ প্রতিভা সকল ক্ষেত্রেই অলৌকিক হলেও সামাজিক প্রতিবেশেই তার প্রকাশ। তাই সাহিত্যবিচারে একমাত্র সামাজিক পশ্চাদপট নিয়েই আলোচনা চলতে পারে’ (কবির ১৩৬৫: ৮৯)।

নজরুল ইসলামের কাব্য-সাধনায় সিদ্ধি কি অসিদ্ধি হুমায়ুন কবিরের প্রধান বিবেচ্য ছিল না। তাঁহার বিবেচনায় ছিল সমাজ জীবনের ঐক্য কিংবা অনৈক্য। সেকালের সমাজ-জীবনের অনৈক্যের মধ্যেই তিনি যেমন রবীন্দ্রনাথের অসারতা দেখিয়াছেন তেমনি একই সমাজ-জীবনের ঐক্যের মধ্যেই খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন নজরুল ইসলামের সারমর্ম। তাঁহার ব্যাখ্যা ষোল আনা অভিনব না হইলেও আমাদের অব্যয় বিবেচনার যোগ্য। সেই কারণেই এখানে একটু চওড়া উদ্ধৃতির আশ্রয় লইতে হইতেছে। হুমায়ুন কবির লিখিতেছিলেন, ‘অসহেযাগ আন্দোলনের যুগে ভারতবর্ষের জীবনধারায় যে বিপুল আলোড়ন, জাতির প্রায় সমস্ত স্তরকেই তা স্পর্শ করেছিল। মহাত্মা গান্ধীর মন্ত্রবলে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ যেন আসন্ন হয়ে উঠল, দিকে দিকে তার চাঞ্চল্য নির্জ্জীবকেও চঞ্চল করে তুলল। বাঙলাদেশে কিন্তু এ জাগরণের যুগে স্বদেশী যুগের মতন সমৃদ্ধ সাহিত্য না দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—তার কারণ কি’ (কবির ১৩৬৫: ৮৯)?

নিজের প্রশ্নের উত্তর সমাজ গড়নের বিশ্লেষণযোগে তিনি নিজেই খুঁজিয়া লইয়াছিলেন। আরও খোলাসা করিয়া বলিলে, সমাজের অধিপতি শ্রেণীর (তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর) শ্রেণীচরিত্র এবং তাহার মানস গড়নে। হুমায়ুন কবিরের বিশ্লেষণ খানিকটা প্রণিধান করা যাইতে পারে। তিনি লিখিতেছেন, ‘হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণীমানস উনিশ শতকে নিজেকে বিকশিত করেছিল। বিংশ শতকের গোড়ায় পৃথিবীর সর্বত্র মধ্যবিত্তশ্রেণীর বিকাশের সম্ভাবনা যখন ফুরিয়ে এল, তখন বাঙলাদেশের অপেক্ষাকৃত পরিণত হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণীর মধ্যেই তার প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। বঙ্গ-ভঙ্গরোধ উপলক্ষ্য হলেও স্বাধীন স্বাজাতিক রাষ্ট্র স্থাপনই ছিল স্বদেশী আন্দোলনের—প্রকৃত এবং ব্যাপক লক্ষ্য। উপলক্ষ্য সাধিত হল কিন্তু লক্ষ্য পূর্ব্বের মতনই দূরপরাহত হয়ে রইল বলে স্বদেশী আন্দোলনের ব্যাপক পরাজয়ে এই শ্রেণী তার আত্মবিশ্বাসও অনেকখানি হারিয়েছিল। তাই অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান যখন এল, তখন গণশক্তির প্রচণ্ড আলোড়নে তার শ্রেণী-মানস স্ববিরোধী দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়ল’ (কবির ১৩৬৫: ৮৯-৯০)।

অখিল ভারতের সাধারণ পরিস্থিতির সহিত হুমায়ুন কবির পরাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিশেষ গড়নের দিকেও দৃষ্টিপাত করিলেন। সেই দৃষ্টির মধ্যে তিনি যুগপদ ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টা করিলেন স্বদেশী আন্দোলনের কবি রবীন্দ্রনাথ কেন অধিকক্ষণ অসহযোগ আন্দোলনের কবি রহিলেন না, আর নজরুল ইসলামই বা কি করিয়া ঐ আন্দোলনের কবি হইয়া উঠিলেন। হুমায়ুন কবির উবাচ: ‘পূর্ব্বেই আমরা দেখেছি যে চাকুরী ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাঙলায় মধ্যবিত্তশ্রেণীর অস্বাভাবিক স্ফীতি ঘটেছিল। তার ফলে বাঙলার হিন্দু জনসাধারণের দু কোটী আড়াই কোটী লোকের মধ্যে প্রায় সত্তর আশী লক্ষ মধ্যবিত্তশ্রেণী-সম্ভ্রমের দাবী রাখে। এটাও লক্ষণীয় যে পশ্চিমে যেমন ব্রাহ্মণের মধ্যেও ভূঁইহারী শ্রেণীর পরিচয় মেলে, বাঙলাদেশে তার কোন নমুনা নেই। এখানে আর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, বর্ণহিন্দু মাত্রই মধ্যবিত্তশ্রেণীভুক্ত। শিক্ষার বিভ্রাটে হিন্দু সমাজের এ অন্তর্বিভাগ আরও বিস্তৃত হয়েছে, তার প্রতি ইঙ্গিতও আমরা করেছি। বাঙলায় যে গত পনেরো ষোল বৎসর রাজনৈতিক মতানৈক্য এবং কর্ম্মপন্থার নানা সঙ্কট, তারও কারণ হয়তো সামাজিক এই পরিস্থিতির মধ্যেই মেলে। সাহিত্যিক ব্যাপারেও তার প্রভাব সুষ্পষ্ট এবং সেইজন্যই অসহযোগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙলাদেশে সবল ও সমৃদ্ধ সাহিত্য গড়ে ওঠেনি’ (কবির ১৩৬৫: ৯০-৯১)।

কাজী আবদুল ওদুদের মতন হুমায়ুন কবিরও দেখি শেষ পর্যন্ত স্থির করিয়াছিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা কালের ধোপে টিঁকিবে না। পার্থক্যের মধ্যে তিনি নজরুল ইসলামের সহিত ‘জসিমুদ্দিনের’ নামটিও জড়াইয়াছিলেন। হুমায়ুন কবিরের বিচার মোতাবেক, ‘পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই’ নজরুল ইসলামের প্রতিভার পরিচয় মিলিবে, নতুন কোন দিকদেশ রচনার সাধ্য উঁহার হয় নাই।’ তাঁহার জবানবন্দী অনুসারে, ‘মুসলমান মধ্যবিত্ত-শ্রেণী সে সময়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং সেইজন্য আশাবাদী, তার সামাজিক সত্তাও নানা কারণে দ্বিধাবিভক্ত হয়নি। সমাজ-জীবনের এই ঐক্যে নজরুল ইসলামের প্রতিশ্রæতির মূল প্রতিষ্ঠিত, এবং সেইজন্যই দেখি যে নিপীড়িত জনমানসের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেবার সাধনা তাঁর রচনায় সবল কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল’ (কবির ১৩৬৫: ৯১)।

হুমায়ুন কবিরের দোসরা প্রস্তাবটি ছিল এই রকম: ‘ঐতিহ্যের লঙ্ঘন তিনি করেননি—পুরাতন পুঁথিসাহিত্যের আবহাওয়ায় লালিত বলে বাঙলার বিপুল কৃষক-সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁর সহজ আত্মীয়তা। ভাষা ও ভঙ্গীতে নজরুল ইসলামের কাব্যে যে বিপ্লবধর্ম্ম, পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই তার পরিচয় মেলে। দেশের গণ-মানসের অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাব্যে [তিনি] যতটুকু রূপান্তরিত করতে পেরেছেন, জসিমুদ্দিনের কাব্য-সাধনায়ও ঠিক ততখানিই [সিদ্ধি]। উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চাদমুখী বলে সে শক্তি কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে অগ্রসর হতে পারেনি। মানস-সংগঠনে রূপান্তর হয়নি বলে দুজনের বেলায়ই সৃজনী-প্রতিভা অল্পদিনেই নিঃশেষ হয়ে এল। আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ’ (কবির ১৩৬৫: ৯১)।

হুমায়ুন কবির জানিতেন, নজরুল ইসলামের কিংবা জসীম উদ্দীনের এই অনর্থ শুদ্ধ তাঁহাদের একেলার অনর্থ ছিল না । কথাটা তিনি আগেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন, ‘… সাহিত্যবিচারে একমাত্র সামাজিক পশ্চাদপট নিয়েই আলোচনা চলতে পারে।’ এই পদ্ধতি অনুসারে তাঁহার সিদ্ধান্ত হতাশাজনক হওয়াই অনিবার্য ছিল। তিনি লিখিয়াছেন, ‘কালধর্ম্মে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং সেই জন্য বর্ত্তমান সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে মুসলমানসমাজে মহৎ কবির আবির্ভাবের সম্ভাবনাও অত্যন্ত অল্প। যে প্রতিভার শক্তি এই সংকীর্ণ পশ্চাদপটের সম্প্রসারণ ও রূপান্তর আনতে পারে, বর্ত্তমানে তার সমস্ত উদ্যম সমাজ-সংগঠনের কাজেই বোধ হয় ব্যয় হয়ে যায়, সাহিত্যসৃষ্টির জন্য আর কিছু বাকী থাকে না। সেই জন্যই সাম্প্রতিক বাঙালী মুসলমান কবিদের মধ্যেই প্রায় সকলেই পশ্চাদমুখী এবং নতুনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীনপন্থী। সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নতুন পরীক্ষা করবার উদ্যম তাঁদের নেই; সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তরে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনায়ও তাঁদের কল্পনা বিমুখ’ (কবির ১৩৬৫: ৯১-৯২)।

৩. ‘মহিমার অবসান’ অথবা বর্তমানের কবি

শুদ্ধ কাজী আবদুল ওদুদ কিংবা হুমায়ুন কবির নহেন, আরও অনেকেই এই সত্যে সন্দেহ রাখেন যে নজরুল ইসলামের সঙ্গেই আধুনিক বাংলা কবিতার জন্ম। তাঁহারা নিশ্চয়ই জানেন গত শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি নজরুল ইসলাম নীচের কবিতাটি লিখিয়াছিলেন, কিন্তু এই কবিতার অর্থ কি তাহা তাহারা জানেন বলিয়া আজও মনে হয় না। তাঁহাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করি—জার্মান তত্ত্বজ্ঞানী বাহ্লটার বেনিয়ামিন রচিত ‘পুনর্জননী কলাকৌশলের যুগে শিল্পকলা’ নামক প্রবন্ধটি পড়িবেন। এই প্রবন্ধের সার প্রস্তাব অনুসারে মহিমার অবসানেই মাত্র আধুনিকতার জন্ম।

মহিমার চারিটি অঙ্গ বেনিয়ামিন নির্দেশ করিয়াছিলেন: এইগুলির অপর নাম—যথাক্রমে ১. সৃজনশীলতা, ২. প্রতিভা, ৩. চিরকালের মর্যাদা এবং ৪. বোধাতীতের হাতছানি। বেনিয়ামিনের মাত্র এক দশক আগেই নজরুল ইসলাম এই সত্যে সহজ ভ্রমণ করিয়াছিলেন। তাহাতে কি সন্দেহ আছে (বেনিয়ামিন ২০০৮, ইসলাম ১৯৬৭)!

কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতাই প্রমাণ করে কবিতায় মহিমার অবসান ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার তত্ত্বগত প্রতিষ্ঠা তাঁহার হাতেই সম্পন্ন হইয়াছিল। পরিশিষ্টে পুরা কবিতাটি উদ্ধার করা হইল।

২ মে ২০২২

দোহাই

১    কাজী আবদুল ওদুদ, শাশ্বত বঙ্গ, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: ব্রাক প্রকাশন, ১৯৮৩) [প্রথম সংস্করণ, ১৩৮৫]।
২    হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, ২য় সংস্করণ (কলিকাতা: চতুরঙ্গ, ১৩৬৫)।
৩    কাজী নজরুল ইসলাম, ‘আমার কৈফিয়ৎ’, নজরুল রচনাবলী, ২য় খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত (ঢাকা: কেন্দ্রীয় বাঙ্লা-উন্নয়ন-বোর্ড, ১৯৬৭), পৃ. ৪১-৪৪।
৪    Walter Benjamin, The Work of Art in the Age of its Technological Reproducibility, and Other Writings on Media, ed. Michael W. Jennings et al., trans. Edmund Jephcott et al. (Cambridge, MA: Harvard University Press, 2008). আবদুল ওদুদ, শাশ্বত বঙ্গ, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: ব্রাক প্রকাশন, ১৯৮৩) [প্রথম সংস্করণ, ১৩৮৫]।

পরিশিষ্ট

আমার কৈফিয়ৎ

কাজী নজরুল ইসলাম

    (১)
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবি’।
কবি ও অকবি যাহা বল মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে বাণী কই কবি?
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!

    (২)
কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে’!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না’ক বই, বয়ে গেছে ওটা!
কেহ বলে বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা!
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, ‘তুই জেলে ছিলি ভালো, ফের যেন তুই যাস্ জেলে!’

    (৩)
গুরু কন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, প্রিয়ে হাটে ভাঙি হাঁড়ি!
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি!
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা কন, ‘আড়ি চাচা।’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি নাড়ি কাছা!

    (৪)
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘মোল্-লা’রা কন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জা’ত মেরে!
ফতোয়া দিলাম—কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজি ও!
‘আমপারা’—পড়া হাম্বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মে’রে!’
হিন্দুরা ভাবে, পার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!

    (৫)
আন্কোরা যত নন্ভায়োলেন্ট্ নন্-কো’র দলও নন্ খুশি।
‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন্’ নাকি আমি বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’ বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় র্চকার গান কেন গাবে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজী ভাবে তাহাদের অঙ্কুশি!

    (৬)
নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘এই তব বিদ্যে ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি’!—
যুগের না হই হুজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্-পেশী।
দু’কানে চশ্মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিঁদ বেশী!

    (৭)
কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত’ ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন নাম!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?

    (৮)
বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে।
হাড় কালি হ’ল, শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না রবি গন্ধীরে।
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!

    (৯)
আমি বলি, ওরে কথা শোন্ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস খোশ্-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস, এবার এ দাঁও ফসকালে
‘ফুল’-নেতা আর হবেনি যে, হায়!—
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে’, নয় পস্তাবি শেষকালে।

    (১০)
বোঝে না’ক যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুনে সবে ভাবে, ভাবনা কি? দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
র’বে না’ক ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তা’রা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ চেয়ে’।

    (১১)
ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন।
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন!
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছ কি? কালি ও চুন
কেন ওঠে না’ক তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?

    (১২)
আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!

    (১৩)
বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না’ক মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!

    (১৪)
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে।
মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো—যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!

 

 

প্রকাশ: তর্ক বাংলা, ৩ মার্চ ২০২২

Leave a Reply

Your email address will not be published.