প্রবন্ধ

সৈয়দ আবুল মকসুদ: ইতিহাসবিদ

Spread the love

তোমরা উঁচা উঁচা পপলার—ওহে মানবকুল এই দুনিয়ার!
তোমরা মুখে কালি সুখশান্তির কূপ, দেখাও মৃত্যুপথযাত্রী তাহাদের ছবি

তোমাকে দেখিলাম, ভগিনী, দাঁড়াইয়া রহিয়াছ এই আলোর ছটায় ।
—পল সেলান (২০০১: ৪৬-৪৭)

 

সৈয়দ আবুল মকসুদের সহিত আমার পরিচয় নিতান্ত পরিণত বয়সে। সেই কারণে তাঁহার বিষয়ে আমার উল্লেখ করিবার মতো বড় কোন স্মৃতি নাই। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই তারিখে আহমদ ছফা পরলোকগমন করিলে ঢাকার শাহবাগে একটি নাগরিক শোকসভা আহুত হইয়াছিল। ঐ সভায় গোটা শতেক নাগরিক বক্তৃতা করিয়াছিলেন। সভায় সবচেয়ে বেশি সারবান কথাটি বলিয়াছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। যতদূর মনে পড়ে তিনি বলিতেছিলেন—তাঁহার মতন এমন নগ্নভাবে নিজের দেশকে ভালোবাসিতে আর কাহাকেও দেখি নাই। কথাটি পরের দিন—৫ আগস্ট—কোন কোন কাগজে শিরোনাম দাঁড়াইয়াছিল। এই ঘটনাটিই সৈয়দ সাহেবের সহিত আমার সাক্ষাৎ-পরিচয়ের ভিত্তি রচনা করে।

আহমদ ছফা মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন কপর্দকশূন্য অবস্থায়। তাঁহার কয়েকজন অনুগামীর উদ্যোগে পরের বছর হইতে ‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা’ প্রবর্তিত হয়। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা প্রদান করিয়াছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। সেই বক্তৃতার শুক্রবিন্দু হইতেই তিনি তাঁহার ‘পথিকৃৎ নারীবাদী খায়রুন্নেসা খাতুন’ গ্রন্থটি নিষিক্ত করিয়াছিলেন। জীবন-কাহিনী লেখার দিকে তাঁহার খুব ঝোঁক ছিল। সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহ, মওলানা আবদুল হামিদ খান, মোতাহের হোসেন চৌধুরী এবং হরিশচন্দ্র মিত্রের জীবন ও কীর্তির কথা তিনি লিখিয়াছেন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তিনি নিজেই আমাকে বারকয়েক বলিয়াছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের জীবন বৃত্তান্ত লইয়া একটি বড় বই প্রায় শেষ করিয়া আনিয়াছেন। এমন অকালে প্রয়াণ না করিলে হয়তো আমরা সেই বই পাঠের উপকার হইতে বঞ্চিত হইতাম না। আশা করি তাঁহার অসমাপ্ত গবেষণাকর্মটি কেহ না কেহ একদিন সমাপন করিবেন।

যতদূর জানিতে পারিয়াছি, সৈয়দ আবুল মকসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগেই পড়াশোনা করিয়াছিলেন। ইতিহাসে উৎসাহ থাকিলেও প্রথাসিদ্ধ ইতিহাস তাঁহার ব্যবসায় ছিল না। তবে জীবনের শেষ দশকে আসিয়া তিনি ইতিহাস বিষয়েও বইপ্রকাশ করিতে শুরু করিয়াছিলেন। এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লইয়া তিনি গোটা তিনটা বই প্রকাশ করিতে সক্ষম হন। একটির নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা’ (২০১৬), আর দুইটির নাম যথাক্রমে ‘স্যার ফিলিপ হার্টগ’ (২০১৬) এবং ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ (২০১৯)। মৃত্যুর একেবারে উপান্তে আসিয়া ‘নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়’ (২০২১) নামে যে গ্রন্থটি তিনি রাখিয়া গিয়াছেন তাহার বিষয়ও—বহুলাংশে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার ধারণা, যে কেহ এই বইগুলির বস্তুনিষ্ঠ বিচার করিবেন তাঁহাকে স্বীকার করিতে হইবে ইতিহাসবিদ অভিধা সৈয়দ সাহেবের সহজপ্রাপ্য। ২০০৭ সালে সৈয়দ আবুল মকসুদের আয়ু ৬০ বছর পুরা হইলে আমরা কয়েক ডজন অনুরাগী ‘আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা’ নামক প্রতিষ্ঠানের পতাকাতলে তাঁহার জন্মদিন পালন করি।

সৈয়দ আবুল মকসুদ যে বছর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করিলেন তাহার আগে—এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাহিনী লইয়া ইংরেজি ভাষায় একটি মোটামুটি চলনসই কেতাব প্রকাশিত হইয়াছিল (রহিম ১৯৮১)। সে বইটি ছিল গোটা কতক তথ্যের সমাহার। তুলনা করিলে সৈয়দ সাহেবের বইটি অনেক বেশি বিচারভিত্তিক। আহমদ ছফার মতন বাঙালি মুসলমান সমাজের বিশেষ সাক্ষাৎ-সমালোচনা তিনি করেন নাই—তাঁহার বিচার পরোক্ষ। আহমদ ছফা অভিযোগ করিয়াছেন:  ‘মুসলমান সাহিত্যিকদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হয়তো চর্বিতচর্বণ নয়তো ধর্মীয় পুনর্জাগরণ। এর বাইরে চিন্তা, যুক্তি এবং মনীষার সাহায্যে সামাজিক ডগমা বা বদ্ধমতসমূহের অসারতা প্রমাণ করেছেন তেমন লেখক—কবি মুসলমান সমাজে আসেননি। বাঙালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে [বেশি] ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসাভাবে অনেক কিছুই জানার ভান করে আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সংকুচিত। বাঙালী মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা একথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না’ (ছফা ১৯৮১: ২৬)। একটু পরেই আমরা দেখিব একই কথাটি সৈয়দ আবুল মকসুদ পেশ করিয়াছেন, তবে পরোক্ষে।

 

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা’ (২০১৬) গ্রন্থে তিনি এদেশে ইতিহাস লেখার সমস্যাটি অল্প কয়েকটি কথায় সুন্দর তুলিয়া ধরিয়াছেন: ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার পরিকল্পনা নিয়ে আমি অন্তত পাঁচজন উপাচার্য ও একজন ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছি। তাঁরা সবাই ব্যক্তিগতভাবে আমার ঘনিষ্ট। [তাঁরা সকলেই] পর্যাপ্ত মৌখিক উৎসাহ দিয়েছেন, সাহায্য-সহযোগিতা নয়। কিন্তু অতীতের কোনো বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজ করতে গেলে তথ্য-উপাত্ত বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহে প্রচুর অর্থের দরকার। সে জন্য ব্যক্তিগত অথবা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা খুবই প্রয়োজন, বিষয়টি উপলব্ধি করার মতো মানুষ বাংলাদেশে বা বাঙালি সমাজে নেই বললেই চলে। ফলে যাঁদের গবেষণা করার আগ্রহ আছে, তাঁরাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন’ (মকসুদ ২০২০: ১৫-১৬)।

আমাদের কপাল, সৈয়দ আবুল মকসুদ উৎসাহ হারাইয়া ফেলেন নাই। বইয়ের মালমশলা সংগ্রহের খাতিরে তিনি লোকের দুয়ারে দুয়ারে ধর্না দিয়াছেন। সৈয়দ সাহেব লিখিয়াছেন, ‘কুড়ি শতকের প্রথম দশকে যাঁদের জন্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ১০ বছর যাঁরা এর ছাত্র ছিলেন অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, এমন প্রায় ১৯০ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ঠাঁটারীবাজারের দোকানদার, নিমতলী ও মৌলভীবাজারের মাংসবিক্রেতা, তাঁতীবাজারের স্বর্ণকার, শাঁখারীবাজারের শাঁখাশিল্পী থেকে শুরু করে বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীগণ পর্যন্ত রয়েছেন’ (মকসুদ ২০২০: ১৬)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিষয়ে লেখা তাঁহার পহিলা বইটির শিরোনামে তিনি মনে হয় ইচ্ছা করিয়াই ‘ইতিহাস’ শব্দটি জুড়িয়া দেন নাই। কারণ—তিনি জানাইতেছেন—‘[এই বইয়ে] প্রতিষ্ঠাপর্ব বা প্রস্তুতিপর্বের ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে, তারপর প্রতিষ্ঠাপরবর্তী প্রধানত এক যুগের কর্মকাণ্ড এই বইয়ের আলোচ্য বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মযজ্ঞের পুরো ইতিহাস লিখতে গেলে কয়েক হাজার পৃষ্ঠার দরকার’ (মকসুদ ২০২০: ১৬)। কথাটার এক আনাও অতিশয়োক্তি নয়।

সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে এমন ‘একটি ধর্মবর্ণনির্বিশেষে শিক্ষিত মধ্যশ্রেণি’ তৈয়ারি করিয়াছে যাঁহাদের মধ্যে ‘এক বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম হয় এবং জাগ্রত হয় স্বশাসিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।’ সৈয়দ সাহেবের বিশ্বাস শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির মধ্যে জাত সেই চেতনা, জাগ্রত আকাঙ্ক্ষা বা সুদৃষ্ট স্বপ্নটি ‘বাস্তবায়িত’ হয় দুইবার—যথাক্রমে ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে। প্রথমবারের বাস্তবায়ন—হইয়াছিল তাঁহার মতে—‘আংশিক সাম্প্রদায়িকতার’ ভিত্তিতে। আর দ্বিতীয়বারের বাস্তবায়ন যেভাবে ঘটিয়াছিল তাহা ‘পূর্ণ ও ধর্মনিরপেক্ষ’। এককথায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মানে বাংলাদেশে বর্তমানে যাঁহারা ক্ষমতায় আছেন বা যাঁহারা ভবিষ্যতে কায়েমমোকাম হইবেন তাঁহাদের—অর্থাৎ মধ্যশ্রেণির—কাহিনী।

‘আংশিক সাম্প্রদায়িকতা’ কথাটারও একটা ব্যাখ্যা লিখিয়াছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। সেই ব্যাখ্যানুসারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে যে শিক্ষিত মধ্যশ্রেণি ‘ধর্মবর্ণনির্বিশেষে’ বাহির হইয়াছেন তাঁহারা ‘আংশিক সাম্প্রদায়িক’। তাঁহাদের পরিচয় ‘শিক্ষিত মুসলমান মধ্যশ্রেণি’। সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখিয়াছেন: ‘অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বাংলার মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এবং দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখলেও শত শত বছর তারা ছিল বিভিন্নভাবে বঞ্চনার শিকার। পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে তাদের যে শুধু মেরুদণ্ড ভেঙে যায় তা নয়, মনও ভেঙে যায়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে নতুন জমিদারি প্রথা প্রবর্তনের পর বাংলায় যাঁরা জমিদার হন, তাঁদের আশি ভাগই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের’ (মকসুদ ২০২০: ২২)।

আহমদ ছফার কথা ছাড়িয়া—১৯৭১ সালের পর যাঁহাদের লেখকখ্যাতি জুটিয়াছে তাঁহাদের মাথা গণনা করিলে—খুব কম লেখককেই দেখা যাইবে নিজেকে ‘বাঙালি মুসলমান’ বলিয়া পরিচয় দিতেছেন। তাঁহার শুদ্ধ ‘বাঙালি’  সৈয়দ আবুল মকসুদ ব্যতিক্রম। ‘বাঙালি মুসলমান’ বলিয়া পরিচয় দিতে যাঁহারা লজ্জা পাইবেন তিনি তাঁহাদের মধ্যে নহেন। আপন ধর্মীয় গোষ্ঠীর খোশামোদি তিনি করিবেন না। প্রমাণ তাঁহার বচন: ‘বাঙালি মুসলমান সমাজের আরেক মারাত্মক শত্রু ছিল ধর্মান্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় নেতারা। ইসলাম সম্পর্কে তাদের মনগড়া সব ব্যাখ্যা ও ফতোয়ায় আধুনিক শিক্ষা থেকেও দূরে সরে থাকে বাংলার মুসলমানরা। অর্থনৈতিকভাবে শোষিত ও দুর্বল এবং আধুনিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকায় অবিলম্বে জীবনের সব দিক থেকেই তারা এক পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তাদের একটি ক্ষুদ্র অংশ আধুনিক উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। এই সুযোগ না পেলে কলকাতা গিয়ে উচ্চশ্রেণির অগ্রসর হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তাঁরা টিকতে পারতেন না’ (মকসুদ ২০২০: ২২-২৩)। আধুনিক শিক্ষা হইতে দূরে সরিয়া থাকার আরও কারণ ছিল। হয়তো এই জায়গায় জায়গার অভাব হওয়ায় তিনি সেই আলোচনার অবতারণা করেন নাই।

সৈয়দ আবুল মকসুদ জানাইতেছেন অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কৃতিত্ব আছে। তাঁহার কথায়, ‘পূর্ব বাংলার আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে যাঁরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হন, তাঁদেরই কেউ কেউ আধুনিক শিল্পকারখানা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন। বহুকাল যে ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল অবাঙালিদের একচেটিয়া, তাতে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শিল্পোদ্যোক্তাদের অনেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র’ (মকসুদ ২০২০: ২৩)। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিবে, বিশ ও তিরিশের কি চল্লিশের দশকের ছাত্রদের কি হইল—তাঁহারা কোথায় গেলেন!

১৯৪৮-১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলায় একটা নতুন জাতীয় চিন্তার সূচনা হয়। এই চিন্তার মধ্যে বাঙালি মুসলমানের বাঙালি ভাব নতুন প্রাণ লাভ করে। মজার কথা, তাহার মুসলমান ভাবটাও লোপ পায় নাই। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলিতেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাপূর্ব সময়ে পূর্ব বাংলার সংস্কৃতিতে মুসলিম সংস্কৃতির প্রতি উপযুক্ত গুরুত্ব ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাশ্বত হিন্দু সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই তাতে যোগ করে মুসলিম সংস্কৃতির উপাদান। ফলে এক নতুন বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম হয়, যে সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সংস্কৃতি থেকে আলাদা’ (মকসুদ ২০২০: ২৪)।

সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখা হইতে আরেকটা গোড়ার খবর জুটিল। এতদিন আমরা যাঁহারা ইতিহাসের দুইটি ভালোমন্দ বই পড়িবার সৌভাগ্য হইতে বঞ্চিত হইয়া ছিলাম এই খবর তাঁহাদের জন্য সওগাতস্বরূপ: ‘আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিরাট ব্যবধান থাকায় এবং অনেকটা ধর্মীয় সংস্কারের কারণেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘকাল দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আলাদাভাবে হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। স্কুল-কলেজে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে লেখাপড়া করলেও দুই ধর্মাবলম্বীর মধ্যে দূরত্ব থেকেই গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই দূরত্ব দূর হতে থাকে’ (মকসুদ ২০২০: ২৪)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ তরুণদের ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ করিতে শিখাইয়াছিল। কিন্তু কিভাবে? সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখিতেছেন: ‘প্রথম অনেক বছর ক্লাসরুমে একদিকে হিন্দুরা আর এক পাশে মুসলমানরা বসতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউটরিয়াল ছিল বিখ্যাত। সেখানে শিক্ষকের সামনে ছাত্রদের ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতে হতো। সেখানে হিন্দু-মুসলমান দূরত্ব ধীরে ধীরে ঘুচতে থাকে। পারিবারিক দিক থেকে যার যে সংস্কারই থাকুক, সতীর্থ হিসেবে অনেকেই তা থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন’ (মকসুদ ২০২০: ২৪-২৫)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ব বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে ভেদবিভেদ না করিয়া শিক্ষালাভেচ্ছু নারীদের মুখেও উচ্চশিক্ষার দরজা খুলিয়া দেয়। বাঙালি মুসলমান সমাজ—নারীপুরুষনির্বিশেষে—শিক্ষায় পিছাইয়া পড়িয়াছিলেন, আর পিছাইয়া পড়াদের মধ্যেও নারীরা ছিলেন সবাইর চেয়ে বেশি পিছাইয়া। তাই সৈয়দ সাহেব বিশেষ করিয়া বলিতেছেন: ‘বাঙালি মুসলমান নারীর মেধা ও প্রতিভা যে অন্য কোনো জাতি ও সম্প্রদায়ের চেয়ে কিছুমাত্র কম নয়, তা প্রমাণের সুযোগ করে দেয় [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]। উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার কারণেই ফজিলতুন নেসা গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করতে পারেন’ (মকসুদ ২০২০: ২৪)।

 

আমরা দেখিয়াছি তাঁহার লেখা মধ্যশ্রেণির ইতিহাসে সৈয়দ আবুল মকসুদ বেশি বেশি জোর দিয়াছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাপর্ব কিংবা প্রস্তুতিপর্বের উপর। সেই পর্বের কিছু সত্য ঘটনা আজ একশত বছরের মাথায় কিছুটা অপ্রীতিকর ঠেকিলেও ঠেকিতে পারে। সত্য গোপন করিয়া কিছুদিন জনসাধারণকে বোকা বানাইতে পারা যায়। কিন্তু অন্ধ হইলে কি প্রলয় বন্ধ থাকিবে? সৈয়দ সাহেব লিখিয়াছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যাঁরা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁরা আজ ইতিহাসের অংশ।’ তিনি জানেন, ইতিহাস মোটেও অতীত হয় না—ইতিহাসের মধ্যে বর্তমান সর্বদাই হাজির থাকে। তাই তিনি পুনশ্চ আওড়াইতেছেন: ‘যাঁরা নিজেরাই ইতিহাস হয়ে গেছেন, তাঁদের অবদান ও কাজের ভুলভ্রান্তি নিয়ে তাঁদের বংশধরদের অথবা সম্প্রদায়ের কারও বিব্রত বোধ করার কিছুমাত্র কারণ নেই।’ পৌনপৌনিক তাঁহার ভাষণ: ‘কুড়ি শতকের প্রথম দশকগুলো ছিল দূষিত, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষে বিষাক্ত। সেই সময়ের উভয় সম্প্রদায়ের নেতাদের ভূমিকা তখনকার পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার্য’ (মকসুদ ২০২০: ১৭)।

মানুষের মধ্যে যাঁহারা—বংশানুক্রমিক কি অনন্যোপায় হইয়া—ক্ষৌরকর্মবৃত্তি অবলম্বন করেন বাংলায় তাঁহাদিগকে ‘নরসুন্দর’ বলা হয়। এই উদাহরণ প্রমাণ ধরিয়া ইতিহাসবিদকে কি ‘ক্ষমাসুন্দর’ বলা চলে? সৈয়দ আবুল মকসুদ বলিয়াছেন: ‘ইতিহাস একসময় সবার দোষই ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখে।’ তিনি যোগ করিয়াছেন, ‘আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক আবহাওয়ায় একটি কথা স্মরণ রাখা দরকার। তা হলো, কে বা কারা কিংবা কোন সম্প্রদায়ের মানুষ কোন প্রেক্ষিতে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার দায় তাঁর বা তাঁদের বা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর বর্তায় না’ (মকসুদ ২০২০: ১৭)। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, এই যুগের বেশির ভাগ মানুষ তাহা মনে করে না।

এই পূর্বাভাস দেওয়ার কারণটা হয়তো নিম্নের উদ্ধৃতি হইতে খানিক পরিচ্ছন্ন হইবে। বুঝিতেছি, সৈয়দ আবুল মকসুদ এক্ষণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা উঠাইবেন: ‘১৯১১ থেকে [১৯২১] সাল পর্যন্ত কলকাতার প্রধান পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, একদিকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রবল বিরোধিতা করা হচ্ছে এবং যাঁরা বিরোধিতা করছেন, তাঁরাই অন্যদিকে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জোরেশোরে কাজ করে যাচ্ছেন। নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর বিশ্বপরিচিতি পেয়ে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার অদূরে বোলপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের জাল বুনছিলেন। পূর্ববঙ্গে তাঁর জমিদারি ছিল, তাঁর আয়ের উৎস ছিল পূর্ববঙ্গ, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো তাঁর ভাষায় ‘পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকা’ নিয়ে তাঁর কোনো উৎসাহ ছিল না। [তিনি] বিশ্বব্যাপী ঘুরেছেন, কিন্তু দীর্ঘ জীবনে ঢাকা এসেছেন মাত্র দুবার—ক্ষণিকের জন্য। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাঁকে সম্মানজনক ডিলিট দেয়, তখনো তিনি তা নিজে এসে গ্রহণ করেননি। অথচ ১৯৩৮ সালে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাঁকে ডিলিট দেয়, তিনি তা নিজে গিয়ে গ্রহণ করেন’ (মকসুদ ২০২০: ৫৮-৫৯)।

সৈয়দ সাহেবের বয়ান আরেকটু উদ্ধার না করি তো এই সংক্ষিপ্ত রচনার ক্ষয়ক্ষতি অধিক হইবে: ‘রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন ১৯২১ সালে, যে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, বিশ্বভারতী ভারতের অন্যান্য মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নয়—অন্য রকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ওখানকার স্নাতক আর কলকাতা বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সমান নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার কারণ সহজেই বোঝা যায়। একই সময় রাসবিহারী ঘোষ ও তাঁর সহকর্মীরা যাদবপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সে বিশ্ববিদ্যালয়ও মানের দিক থেকে ভারতবর্ষের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ নয়—অনেকটা নীচে। সরকারি খরচে ঢাকায় একটি আধুনিক ও আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং সেখানে ইসলামি ও মুসলিম সংস্কৃতির বিষয়টি প্রাধান্য পাবে—তাতে ঘোষের ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বানচালের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন।’ (মকসুদ ২০২০: ৫৯)

রাসবিহারী ঘোষের এই বিরোধিতার গোড়ার কারণ নির্দেশ করিতে হইলে কয়েকটি ঘটনা স্মরণ করা যাইতে পারে। ১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই তারিখে আসাম, পূর্ব ও উত্তর বাংলা (অর্থাৎ চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকা বিভাগ, রাজশাহী বিভাগ—তবে দার্জিলিং ছাড়া, পার্বত্য ত্রিপুরা এবং মালদহ জেলা) লইয়া একটা নতুন প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হইয়াছিল। নতুন প্রদেশের আয়তন ১০৬,৫৪০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৩,১০,০০,০০০। ইহার মধ্যে মুসলমান ১,৮০,০০,০০০ আর হিন্দু ১,২০,০০,০০০। নতুন প্রদেশের রাজধানী হইবে ঢাকা। এই ঘোষণা কার্যকর হয় সে বছরের ১৬ অক্টোবর।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যাহা ‘স্বদেশী আন্দোলন’ নামে বিখ্যাত তাহার গোড়া এখানেই। এই বিভাগের ফলে পূর্ব বাংলা ও আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানগণ সন্তুষ্ট ও লাভবান হয় কিন্তু দুই প্রদেশেরই বাঙালি হিন্দু ভূমিমালিক, উচ্চশ্রেণির বৃত্তিব্যবসায়ী এবং তাহাদের প্রভাবাধীন জনসাধারণও অসন্তুষ্ট হয়। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ বাতিল করা হইলে পরের বছর—১ এপ্রিল তারিখ হইতে—ঢাকা তাহার পূর্বতন জেলা-শহর মর্যাদায় ফিরিয়া যায় (খান ১৯৯৪: ৩৭২-৭৩)।

এই বিভাগ রদের ক্ষতিপূরণস্বরূপ ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তারিখে সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা সরকারের এই সিদ্ধান্তেও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিয়াছিলেন। মুহম্মদ সিদ্দিক খান লিখিয়াছেন, ‘ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল পরিকল্পনা (যাহাতে মুসলমানদের পক্ষে একটা সুবিধা ছিল) পরিবর্তন করা হয়। লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার রাসবিহারী ঘোষকে তাড়াহুড়া করিয়া নিশ্চয়তা প্রদান করিলেন যে, “কোনক্রমেই এ কথা বলা যায় না যে নূতন বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র মুসলমানদের জন্য হইবে; এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সকলের সমান অধিকার থাকিবে—ইহা হইবে শিক্ষাদাত্রী আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ”’ (খান ১৯৯৪: ৩৭৩; অনুবাদ পরিমার্জিত)।

মুহম্মদ সিদ্দিক খান আরো একপ্রস্ত মন্তব্য উদ্ধার করিয়াছেন। আশা করি এই জায়গায় তাহার পুনরাবৃত্তি বাহুল্য বিবেচিত হইবে না। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বিতরিত প্রশ্নমালার উত্তরস্বরূপ জনৈক সরকারী কর্মকর্তা—এ.এফ.এম. আবদুল আলী—চমৎকার লিখিয়াছিলেন: ‘সাধারণের বিশ্বাস, বিভাগ রদ নির্বিবাদে মানিয়া লইবার পুরস্কার হিসাবে পূর্ব বাংলার মুসলমানদিগকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পকেট সংস্করণ দেওয়া হইতেছে। যদি একথা সত্য হয় তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতা যথাসম্ভব বৃদ্ধি করা উচিত।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছিলেন আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফায়দা মুসলমান সমাজ ভোগ করিতে পারিবেন না—লিখিলেন, ‘সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়তো ঠিক কাজই হইবে; কিন্তু ইহাতে পূর্ব বাংলার মুসলমান সমাজের বেশির ভাগের পক্ষে কোন ফায়দা জুটিবে না। এই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় চিরকাল ব্যাপিয়া গরিব মুসলমান সমাজের বেশির ভাগ মানুষের নাগালের বাহিরেই থাকিয়া যাইবে, ইহা তাহাদের পক্ষে একটা বিলাসের বিষয় বৈ হইবে না’ (খান ১৯৯৪: ৩৭৪)।

আমরা প্রায় প্রতিদিনই শুনিয়া আসিতেছি—ইতিহাস কাহাকেও ক্ষমা করে না। আর একটু আগেই আমরা দেখিলাম, সৈয়দ আবুল মকসুদ আমাদের শিখাইয়াছেন: ‘ইতিহাস একসময় সবার দোষই ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখে।’ ক্ষমা কি পদার্থের নাম? আশা করিতেছি সৈয়দ সাহেবের সিদ্ধান্ত হইতেই ইহার উত্তর শেখা যাইবে।

পূর্ব বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের কথা প্রায়শ বলা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শুরু থেকেই একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারা পূর্ব বাংলার সব ধর্মবর্ণের মানুষ উপকৃত হয়েছে। বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে গ্রামীণ মুসলমান মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে ২৫ বছরের মধ্যে পূর্ব বাংলায় একটি নতুন হিন্দু-মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয় যারা জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন।’ (মকসুদ ২০২০: ১২৭)

আহমদ ছফা একদা—সৈয়দ আবুল মকসুদের প্রায় চল্লিশ বছর আগে—যে প্রশ্ন করিয়াছিলেন এই সিদ্ধান্তের মধ্যে তাহার কোন সদুত্তর পাইলাম না। ছফার জিজ্ঞাসা ছিল এই: ‘উত্তর ভারতেও মুসলিম শাসক নেতৃশ্রেণী এইভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন, অধিকন্তু তাঁদের অনেকেই [১৮৫৭-৫৮ সালের] সিপাহী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারপরেও তাঁরা কি করে এগিয়ে আসতে পারলেন এবং তাদের মধ্যে কেন সৃষ্টি হলো স্যার সৈয়দ আহমদের মতো একজন মানুষ। বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে তেমন একজন মানুষ জন্মালেন না কেন?’ (ছফা ১৯৮১: ১৯১)।

 

২২ অক্টোবর ২০২১

 

দোহাই

১. সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা, ২য় সংস্করণ (ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ২০২০)।

২. আহমদ ছফা, বাঙালী মুসলমানের মন (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮১)।

৩. মুহম্মদ সিদ্দিক খান, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, অনুবাদ: ফজলুল আজীম, মুহম্মদ সিদ্দিক খান রচনাবলী, ১ম খণ্ড, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪), পৃ. ৩৭১-৩৮৪।

৪. Muhammad Abdul Rahim, The History of the University of Dacca (Dacca: Univeristy of Dacca, 1981).

৫. Paul Celan, Selected Poems and Prose of Paul Celan, trans. John Felstiner (New York: W.W. Norton, 2001).

Leave a Reply

Your email address will not be published.