প্রবন্ধ

বাংলার রেনেসাঁসের পরিণতি: শেখ মুজিবের স্মৃতিকথা

Spread the love
অসমাপ্ত আত্মজীবনী

কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য। মানুষ মানুষকে এইভাবে হত্যা করতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়। — শেখ মুজিবুর রহমান (২০১২ [ক]: ৬৬)

দাঙ্গা এক দিনে শেষ হয়নি। মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু এই সময় বাংলা দ্বিখণ্ডিত করার পক্ষে রায় দেয়। সিদ্ধান্ত হয়—পশ্চিমবঙ্গ ভারতবর্ষের অংশ হবে আর পূর্ববঙ্গের নতুন নাম হবে পূর্ব পাকিস্তান। এইসব সাতবাসি কথা পুনরাবৃত্তি করছি, কারণ দেখেছি আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে এইসব অতিপরিচিত তথ্য সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন। —তপন রায়চৌধুরী (২০০৭: ১৫৮-৫৯)

 

ইতিহাস ব্যবসায়ী স্যার যদুনাথ সরকার একদা ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে ভারতবর্ষের মধ্যযুগ শেষ আর তাহার আধুনিক যুগ শুরু হয়।’ বলাবাহুল্য, দিনটি ছিল বিষ্যুদবার। এই অসামান্য সম্মান সেই সামান্য বিষ্যুদবারের ভাগ্যে কেন জুটিল তাহা লইয়া কোন মতভেদ নাই। যদুনাথ সরকার মনে করেন, ‘নবাবের কলিকাতা দখলের—ঘড়ির কাঁটায় মিলাইয়া বলিতে—এক বছর দুইদিন পর, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, মোতাবেক বৃহস্পতিবার দিনটি এমন এক লড়াইয়ের সাক্ষ্য হইয়া দাঁড়াইল ভারতবর্ষের জীবনধারায় বিপ্লব ঘটানোই ছিল যাহার নির্বন্ধ।’ (সরকার ১৯৭৬: ৪৯৭, ৪৯০)

এই আধুনিক যুগের অবসান কখন হইল, তাহা জানিবার অবকাশ অবশ্য আমাদের স্বনামধন্য ইতিহাস ব্যবসায়ীর হয় নাই। এই যৎসামান্য নিবন্ধযোগে আমরা নিবেদন করিতে চাহিব, ভারতবর্ষের না হউক, অন্তত বাংলাদেশের আধুনিক যুগ শেষ হয় ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট তারিখে। দুর্ভাগ্যক্রমে, যদুনাথবাবু সেই তারিখেও প্রাণে বাঁচিয়া ছিলেন। শুদ্ধ তাহাই নহে, ঐ যুগের অবসান ঘটিবার আনুমানিক দুই বছর পর—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত বাংলাদেশের ইতিহাস: দ্বিতীয় খণ্ড গ্রন্থে—মাত্র আধুনিক যুগের জন্মদিন সংক্রান্ত তাঁহার ঘোষণাটি মুদ্রিত হইয়াছিল।

যদুনাথ সরকারের বছর দুয়েক আগে—আমাদের পরম দুর্ভাগ্যের বছরটিতে—আরেকজন ইতিহাস ব্যবসায়ী—নাম সুশোভন সরকার—ভারতবর্ষের আধুনিক যুগ যে বাংলাদেশেই জন্মগ্রহণ করিয়াছিল সে সত্য স্মরণ করাইয়া দিতে পিছপা হন নাই। সুশোভনবাবু লিখিয়াছিলেন, ‘ব্রিটিশ শাসন, বুর্জোয়া অর্থব্যবস্থা আর আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বাংলাদেশেই প্রথম প্রভাব বিস্তার করে আর সচরাচর বাংলার রেনেসাঁস নামে পরিচিত আন্দোলনটির সূচনা ঘটায়।’ তাঁহার কথায়, ‘প্রায় একশত বছর ধরিয়া আধুনিক দুনিয়া কোন পথে পরিবর্তিত হইতেছে তাহা জানিয়া-শুনিয়া জাগিয়া উঠিবার ঘটনা ভারতবর্ষের বাদবাকি অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশেই অধিক ঘটিয়াছিল আর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আগাইয়াও ছিল বাংলাদেশ। তাই আধুনিক ভারতবর্ষের জাগরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে ভূমিকা পালন করে তাহা এয়ুরোপের রেনেসাঁসের কাহিনীতে ইতালি যে পদটা দখল করিয়াছিল তাহার সহিত তুলনীয়।’ (সরকার ১৯৮১: ৩)

১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাস নাগাদ যদুনাথ সরকার যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা নিঃসন্দেহে এখনও কৌতুহলের সামগ্রী। ‘রেনেসাঁস’ কথাটার সদ্ব্যবহার করিবার পর তিনি লিখিলেন: ‘ইহা ছিল সত্যকারের রেনেসাঁস, কনস্তান্তিনোপলের পতন ঘটিবার পর এয়ুরোপে যে রেনেসাঁস দেখা দিয়াছিল তাহার তুলনায় প্রশস্ততর, গভীরতর এবং অধিকতর বিপ্লবী। বাংলাদেশকে বেদের যুগে পাখির বাসভূমি (মানুষের নহে) বলিয়া ঘৃণা করা হইত এবং এক কোণায় ঠেলিয়া দেওয়া হইয়াছিল; মহাকাব্যের যুগে বলা হইয়াছিল এই দেশটি ভ্রাম্যমান পাণ্ডবকুলের পদধুলি যে যে এলাকায় পড়িয়া থাকিবে তাহার আওতাবহির্ভূত; আর মোগল আমলে তো ইহার খ্যাতি দাঁড়াইয়াছিল “খাদ্যসম্ভারে পরিপূর্ণ দোজখবিশেষ” বলিয়া। কিন্তু এক্ষণে ব্রিটিশ সভ্যতার প্রভাবে পড়িয়া এই দেশটি হইয়াছে ভারতবর্ষের বাদবাকি অঞ্চলের পক্ষে পথপ্রদর্শক এবং আলোকবর্তিকাবাহকস্বরূপ। এক নিঃশ্বাসেই যদুনাথ সরকার জানাইলেন, দেশের নানান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এক জায়গায় আনিয়া এবং পরস্পর যুযুধান বিভিন্ন গোষ্ঠী আর সম্প্রদায় একপাত্রে মিশ্রিত করিয়া মুসলমান যুগের শেষ নাগাদ একটি বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী (পিপল) গড়িয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু সেই জনগোষ্ঠী জাতি (নেশন) হইয়া সারে নাই, কেননা তাহার নানান পূর্বশর্ত তখন পর্যন্ত পূর্ণ হয় নাই। স্যার যদুনাথের কথায়, ‘দুইশত বছরের ব্রিটিশ শাসন এবং পড়শি ব্রিটিশ সমাজের নজির এক্ষণে বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীর বিশাল বিশাল কতকগুলি খণ্ডকে পিষিয়া পিষিয়া, গুঁড়া গুঁড়া করিয়া, জীবন ও ভাবধারার সেই ঐক্যে মিলাইয়া দিল যাহা না হইলে জাতির সৃষ্টি হয় না।’ (সরকার ১৯৭৬: ৪৯৮-৪৯৯)

ব্রিটিশ শাসনের শেষ বছরের আগের বছরটায় আমরা কি দেখিলাম? কেমন জাতির সৃষ্টি হইল? পরের যুগের ইতিহাস ব্যবসায়ী তপন রায়চৌধুরী যাহা লিখিয়া গিয়াছেন তাহা পড়িলে মনে হয় যদুনাথ সরকারের বিচারে কোথায়ও বা বড় আকারের একটা ফাঁক রহিয়া গিয়াছে। রায়চৌধুরী এক জায়গায় লিখিয়াছেন, ‘শিক্ষিত বাঙ্গালি হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ, এমন একটা গর্ব আমার ছিল। ঐ তিন দিন [১৯৪৬ সালের ১৬-১৮ আগস্ট] আমি যাহা দেখিয়াছিলাম তাহা সেই আত্মমর্যাদাবোধ চিরকালের মতো ধ্বংস করিয়া দিয়াছে।’ (রায়চৌধুরী ২০১১: ১৭২)

রায়চৌধুরীর এই হতাশার কারণ তিনি নিজেই অনেক জায়গায় বিশদ করিয়াছেন। আমরা একটি কি দুইটি জায়গায় দেখিব কি বলিয়াছেন তিনি: ‘মানিকতলা বাজারের প্রায় উলটো দিকে বিডন স্ট্রিটের উপর আমাদের হস্টেল। পাড়ার বাসিন্দা প্রায় সবাই বাঙালি হিন্দু। শুধু হস্টেলের সামনে এক সারি দোকানের পিছনকার বস্তিতে কিছু ফিরিওয়ালা শ্রেণির গরিব বিহারি আর উত্তরপ্রদেশের লোকের বাস। আর আমাদের পাঁচমিশালি হস্টেলের বাবুর্চি খিদমতগার সবাই বিহারি মুসলমান। আমাদের পাড়ায় কোনও গোলমালের আশঙ্কা আছে এমন আমাদের মনে হয়নি।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫১)

ঘটনার বিবরণ যতটা সম্ভব ঘোড়ার মুখ হইতেই শুনিতে চাহিব আমরা। তপনবাবু লিখিতেছেন, ‘সকাল ন’টা নাগাদ সার্কুলার রোডের বস্তি থেকে হতদরিদ্র কিছু মুসলমান লিগের ঝাণ্ডা হাতে স্লোগান দিতে দিতে বিডন স্ট্রিটে ঢোকে এবং মোড়ের মিঠাইয়ের দোকানটি লুঠ করে। পরে শুনি, কলকাতায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামে এটাই নাকি প্রথম ঘটনা। ব্যাপারটা পূর্বপরিকল্পিত মনে হয় না। জলুশধারীরা মিঠাই লুঠ এবং লুণ্ঠিত মিঠাই ভক্ষণ ছাড়া আর কোনও হিংসাত্মক কাজ করেনি বলেই আমার ধারণা। তার পরই পালা জমে উঠল।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫১-৫২)

এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলিয়া রাখিতেছি, এই বিবরণের সহিত আরেক প্রত্যক্ষদর্শী—ইঁহার নাম মীজানুর রহমান—যাহা দেখিয়াছিলেন তাহার বহুলাংশে মিল আছে। তিনিও মানিকতলার কাছাকাছি গড়পার নামের কোন এক জায়গায় বসবাস করিতেন সেই সময়। তাঁহার জবানে শুনি: ‘আমাদের বাসা থেকে দুতিনটে বাড়ি পরেই বড় রাস্তা, অর্থাৎ আপার সার্কুলার রোড।’ (রহমান ২০১৩: ২৮)

রায়চৌধুরীর উদ্ধৃতি আর একটুখানি: ‘আমাদের হস্টেলের এক মুসলমান আবাসিক এসে খবর দিলেন—অবস্থা ভাল নয়। তিনি রাজাবাজারের ভিতর দিয়ে পায়ে হেঁটে এসেছেন। উনি স্বচক্ষে দেখেছেন—ওখানকার কসাইরা বড় বড় ছুরি আর দায়ে শান দিচ্ছে। ওঁর পরণে ধুতি থাকায় ওঁর দিকে সবাই বিষদৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল, তবে কেউ আক্রমণ বা পরিচয় জিজ্ঞেস করেনি। … আবাসিকটি এই খবর আনার অল্পক্ষণ পরেই নানা গুজবে হস্টেলের আবহাওয়া গরম হয়ে উঠল। রাজাবাজার, কলুটোলা, পার্ক সার্কাসে নাকি হাজার হাজার হিন্দু খুন হয়েছে। কত হিন্দু মেয়ে যে লাঞ্ছিত বা ধর্ষিত হয়েছে তার সীমাসংখ্যা নেই।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫২)

একটু পরের ঘটনা: ‘দিন যতই গড়াতে লাগল গুজবে গুজবে হাওয়া ক্রমেই গরম হয়ে উঠল। বিকেল নাগাদ নতুন এক রাজনৈতিক থিসিস কানে এল, “অফেন্স্ ইজ দা বেস্ট মিনস্ অফ ডিফেন্স” অর্থাৎ “হে হিন্দু সন্তানগণ, খরকরবাল হাতে নিয়ে এবার তোমরা যবননিধনের জন্য প্রস্তুত হও।” হস্টেলের স্পোর্টস রুম থেকে সব হকি স্টিক বের হয়ে এল। দু-চারটে বন্দুক, কিছু গোলাগুলিও অজ্ঞাত কোনও উৎস থেকে সংগৃহীত হল। কোথা থেকে যেন বেশ কয়েক টিন কেরোসিনও জোগাড় হয়েছে দেখলাম। সংগ্রামী পুরুষদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বামপন্থী ছাত্রও আছেন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। অন্য সকলের সঙ্গে কোনও আলোচনা তখন আর সম্ভব না। তাই আগ্রাসী হিন্দু বনে যাওয়া বামপন্থীদেরই শুধু জিজ্ঞাসা করি—নীতির কথা ছেড়ে দিলেও তারা যা করতে যাচ্ছে—তাতে কার কী লাভ হবে। উত্তর পেলাম—মুসলমান খুন হচ্ছে এই খবর যথাস্থানে পৌঁছলে হিন্দু হত্যা বন্ধ হবে। বললাম—হিন্দু হত্যার খবর বা গুজব যথাস্থানে পৌঁছনোর ফলে তো তোমরা মুসলমান মারার জন্য উদ্যোগী হয়েছ। মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া তোমাদের থেকে ভিন্ন হবে মনে করছ কেন? উত্তর—এখন কাজের সময়। বাজে কথা শোনার তাদের অবসর নেই।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫৩)

তপনবাবু আরো লিখিতেছেন, ‘অন্ধকার একটু ঘন হওয়ার পর আসল “কাজ” শুরু হল। বেশ করে খাওয়াদাওয়া সেরে বীরবৃন্দ রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন, হাতে কেরোসিনের টিন এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র। ভাবলাম আমাদের পাড়ায় তো মুসলমান নেই। তবে বীরকৃত্যটা এঁরা কোথায় করবেন? পার্ক সার্কাস বা রাজাবাজার অভিযান করে শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলা হবে? না, না! অকারণ ঝুকি নেওয়ার লোক এঁরা না। আর একটু রাত বাড়লে বন্দেমাতরম্ ধ্বনি তুলে সশস্ত্র যোদ্ধারা সার্কুলার রোড পার হয়ে রাস্তার পাশের মুসলমান বস্তি আক্রমণ করলেন। ওখানকার হতদরিদ্র বাসিন্দারা কোনও হিন্দুকে হত্যা করেনি অথবা হিন্দু নারীকে লাঞ্ছনা [লাঞ্ছিত] করেনি। দুষ্কর্মের মধ্যে তাদের কেউ কেউ সকালবেলার মিষ্টান্ন লুণ্ঠনে শরিক হয়েছিল।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫৪)

তপন রায়চৌধুরী কেন তাঁহার স্বপ্রজাতিভুক্ত ভদ্রলোকদের আর বিশ্বাস করিতে পারেন নাই তাহার কারণ-নির্দেশক শেষ একটা অধ্যায় এখানে পেশ করিব: ‘ক্রমে ক্রমে আরও সব বীভৎসতার কাহিনি এল। রাজাবাজারে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট হস্টেলের ছ’টি ছেলে খুন হয়েছে শুনলাম। একজন ক্ষতবিক্ষত হয়েও বেঁচে ছিল। আমার পিসতুতো দিদির বাড়িতে আক্রমণের কথা আগেই লিখেছি। নানা খুনজখম বলাৎকারের কাহিনি চারিদিক থেকে আসতে থাকে। তার কিছু সত্য, অধিকাংশই মিথ্যা। বীভৎস সব কাহিনি রটিয়ে কিছু লোক এক ধরণের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্য বা কল্পিত কাহিনি বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমতো বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পণ্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানের কাহিনি বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারেনি। ছেলেটি বলছিল—কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্ধিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমরা শুনেছিলাম, এই কুকীর্তির নায়ক কিছু বিহারি কালোয়ার। তাই ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন, ‘এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?’ শুনে সেই পণ্ডিতপ্রবর গর্জে উঠলেন, ‘কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫৬)

এই সুশোভনবাবু যদি আমাদের খ্যাতনামা ইতিহাস ব্যবসায়ী সুশোভন সরকার হইয়া থাকেন, বিস্মিত হওয়ার কারণ নাই। বাংলার রেনেসাঁসের এই করুণ পরিণতি তিনি নিশ্চয়ই আশা করেন নাই। এই উপাখ্যান হইতে—আশা করি—কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাইবে একদা যে বস্তুকে ‘বাংলার রেনেসাঁস’ বলা হইয়াছিল তাহার পরিণতি কেন এহেন ‘বর্বরতা’য় পর্যবসিত হইয়াছিল। সুশোভন সরকার পরাধীন বাংলাদেশের সহিত বহুধাবিভক্ত নগরকেন্দ্রিক ইতালির তুলনা করিয়া যে ফাঁদে ধরা দিয়াছিলেন আমরা সেই ভ্রান্তিবিলাসে গা ঢালিয়া দিতে চাহি না। পরাধীন বাংলাদেশের যে পরিণতি ১৯৪০ সালের দশকে দেখা গিয়াছিল তাহার সহিত ১৯২০ সালের পরের নাতিপুরাতন নবগাঁটছড়াবাঁধা দেশ ইতালি কিংবা জার্মানির তুলনা কাটা নানাদিক হইতে সমীচীন হইবে না।

পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তনশীল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যে কারণে বাংলাদেশকে খর্ব করা হইয়াছিল, ১৯৭১ সালের পরও সেই কারণগুলি বহাল থাকিয়া গিয়াছে। উদ্বেগের তাই অবসান হয় নাই। এখানে বলিয়া রাখার প্রয়োজন আছে, ইতিহাসের যে প্রবণতা লইয়া আমাদের বিশ্লেষণ বা বিবেচনা আমরা নিজেরাও তাহার উপরে নহি। কোন কোন কারণে রেনেসাঁস বলিয়া কথিত সাংস্কৃতিক প্রগতি শেষ পর্যন্ত তাহার বিপরীত প্রবণতায় পরিণত হইল তাহাই আমাদের অনুসন্ধানের বিষয়। (হরখাইমার ও আডর্নো ২০০২)

একদিকে জয়হিন্দের জয়ধ্বনি অপরদিকে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের তুর্যনাদের ডামাডোলে বাংলার রেনেসাঁস সহমরণে গিয়াছিল ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট। ঐ চিতার ছাই হইতেই সিকি শতাব্দী পর জাগিয়া উঠিয়াছিল নতুন রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত নতুন বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথায় পাওয়া ১৯৪৬ সালের অজ্ঞান সাক্ষ্য বিচার করিয়াই এই নিবন্ধ শেষ করিব। (রহমান ২০১২ [ক])

 

১৯৭১ সালে ঢাকায় বাংলাদেশের নতুন স্বাধীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। কিন্তু এই রাষ্ট্রের চতুঃসীমা—নির্ধারিত হইয়াছিল আগেভাগেই—সেই ১৯৪৭ সালে—এই কথা ভুলিয়া গেলে চলিবে না। যখন স্পষ্ট হইল ভারতবর্ষ ভাগ একপ্রকার অনিবার্য তখন কলিকাতা মহানগরী কোথায় যাইবে—সখণ্ড ভারতে না পাকিস্তানের পূর্বখণ্ডে—অলিখিত এই প্রশ্নের ফয়সালাই ছিল ১৯৪৬ সালের খুনখারাবির মূলে—একথাটা না বলিলেও চলে। যে কারণেই ঘটনার নাম ‘দি গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ জারি হউক না কেন নামটা অসার্থক হয় নাই।

ইংরেজ জাতির ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭০৭ সালে বাংলাদেশের যে কলিকাতা শহরকে আলাদা বাংলা প্রেসিডেন্সি বা প্রেসিডেন্ট-শাসিত অঞ্চলের রাজধানী ঘোষণা করিয়াছিল, সেই কলিকাতা ১৮৩৩ সাল নাগাদ ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের রাজধানীর মর্যাদা পায়। এখানে রাজধানী শব্দের অর্থ দাঁড়াইতেছে বড়লাট বা গভর্নর জেনারেলের আর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিষ্ঠান শহর। ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সরাইয়া নেওয়ার আগ পর্যন্ত কলিকাতাই সেই মর্যাদার অধিকারী ছিল।

ইহার পর কলিকাতার রাজনৈতিক মর্যাদার মধ্যে বাকি ছিল সেখানে কখনো কখনো ভারতীয় জাতীয় মহাসমিতি বা কংগ্রেসের অধিবেশন বসিবার ঘটনাটি। একটা কথা উল্লেখ না করিলে অবশ্য অন্যায় হইবে, রাজধানী দিল্লী লইয়া যাওয়া সত্ত্বেও দেশের ছোটরাজা বা বড়লাট হর শীত মৌসুমটা কলিকাতাতেই খরচা করিতেন এবং এই শহরটাকে দেশের শীতকালীন রাজধানী গণনা করা হইত। এককথায়, তখনও দেশের আর দশ শহরের মধ্যে সর্বাধিক মূল্যবান শহর ছিল কলিকাতা। (আজাদ ১৯৮৮: ১৯)

ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী না থাকিলেও অতঃপর কলিকাতাই হইয়া দাঁড়াইল পুনরেকত্রিত বাংলা প্রদেশের প্রাণকেন্দ্র। ১৯৪৬-৪৭ সালের মধ্যে এই মর্যাদার মূলেও কুঠারের ঘা পড়িল। যবনিকা পতন হইল বাংলার রেনেসাঁসের। বাংলার ইতিহাসের এই পরিণতি কেন হইল তাহা না বুঝিতে পারিলে ১৯৭১ সালে যে সার্বভৌম রাষ্ট্র ঐতিহাসিক বাংলাদেশের পূর্বখণ্ডে স্থাপিত হইয়াছে তাহার তাৎপর্য অনুধাবন করাও কঠিন হইবে।

সৌভাগ্যক্রমে নতুন বাংলাদেশে যিনি একাধারে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছেন তিনি তাঁহার ছাত্রজীবনের সিংহভাগ সে যুগের কলিকাতা শহরেই কাটাইয়াছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট তিনিও কলিকাতায় উপস্থিত ছিলেন। ঐ দিনের আকুল উদ্বেগের বিষয়ে গোটা বিশ বছর পর তিনি স্মরণ করিয়াছিলেন, ‘আমি নিজেও খুব চিন্তাযুক্ত ছিলাম। কারণ, আমরা ছয় ভাইবোনের মধ্যে পাঁচজনই তখন কলকাতা ও শ্রীরামপুরে।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৫)

শেখ মুজিবুর রহমানের বহু বিলম্বে প্রকাশিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-যোগে আমরা বাড়তিমূল্যস্বরূপ পুরানা বাংলাদেশের শেষ পর্বের একটা পরিষ্কার ছবিও পাই। এই ছবি অন্য অনেক লেখকের রচনায়ও পাইতেছি। কিন্তু শেখ মুজিবের আত্মজীবনী হইতে জানা যায়, সেদিন যাঁহারা দাঙ্গা প্রতিরোধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে তিনিও একজন । যেমন দাঙ্গা প্রতিরোধে, তেমনি বাংলার আসন্ন ভাঙ্গন রোধেও তিনি সমান আবেগের সহিত লড়াই করিয়াছিলেন। তাঁহার পৈতৃক নিবাস পূর্ববঙ্গে হওয়া সত্ত্বেও তিনি বঙ্গবিভাগ সমর্থন করেন নাই। তাঁহার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার দাবিতে অটল ছিলেন। শেষ পর্যন্ত, অগতির গতি, তিনিও ‘দলিতমথিত আর পোকায় কাটা’ পাকিস্তান কবুল করিয়াছিলেন—একথা সত্য। এসএ করিম একদা লিখিয়াছিলেন, ‘পাকিস্তানের লড়াইয়ে সাধারণ পদাতিক সৈন্যের কাজ করিয়াছিলেন বলিয়া মুজিব গৌরব বোধ করিতেন’। কথাটা মোটেও মিথ্যা নয়। (করিম ২০০৬: ২৯-৩০)

ঐদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদলে—বা নিদেনপক্ষে অপরোক্ষ শ্রোতাপক্ষে—আবুল মনসুর আহমদও ছিলেন। তাঁহার ভাষায়, ‘১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলিকাতায় কেয়ামত নামিয়া আসিল।’ কেয়ামত কি জিনিশ তিনি তাহার ব্যাখ্যাও বিশদ করিয়াছেন: ‘কলিকাতায় দুইটা মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ দুইটার সময়েই আমি কলিকাতায় উপস্থিত ছিলাম। একটা ১৯২৬ সালের এপ্রিলে, অপরটা ১৯৪৬ সালের আগস্টে। গভীরতা, ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতা সকল দিক থেকেই ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ১৯২৬ সালের দাঙ্গার চেয়ে অনেক বড় ছিল।’ (আহমদ ২০০১: ১৫১)

তপন রায়চৌধুরী কিন্তু এই দাঙ্গাকে দাঙ্গাই বলিতে চাহেন নাই। তাঁহার কথায় কোন সার নাই এমত নয় কিন্তু। তিনি লিখিয়াছেন, ‘অন্যত্রও লিখেছি—আমার ধারণা, ’৪৬ সনে কলকাতা শহরে দাঙ্গা বলতে যা বোঝায় তা বিশেষ ঘটেনি। দুই দল ক্ষিপ্ত মানুষ পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করছে, এ দৃশ্য যতই বেদনাদায়ক হোক, মানুষের ইতিহাসে সংঘাত অপরিহার্য জেনে ওই দৃশ্যে কোথায় যেন একটু মনুষ্যত্বের তলানি পাওয়া যায়। কিন্তু [সেদিন] কলকাতার রাস্তায় যা ঘটেছিল তার ভিতর মনুষ্যোচিত কোনও ব্যবহারের লক্ষণ দেখা যায়নি। বিবেকবর্জিত কিছু দ্বিপদ সম্পূর্ণ অসহায় কিছু নারী-পুরুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫৪)

কলিকাতা শহরে ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে এই দাঙ্গা কেন দেখা দিয়াছিল তাহা লইয়া ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বৃথা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এক চরিতকার লিখিয়াছেন, ‘কলিকাতার দাঙ্গা সম্পর্কে বিরোধী দলের নেতা মিঃ কিরণ শঙ্কর রায় ও ডাঃ শ্যামপ্রসাদ মুখার্জি ও অন্যান্য হিন্দু নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা ও প্রধান-মন্ত্রী মিঃ সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করেন। কিন্তু ১৬ই আগষ্ট কলিকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও অন্যান্য হাসপাতালের রিপোর্ট হইতে পরিষ্কার রূপে প্রমাণিত হয় যে, উক্ত তারিখে যেসব আহত ও মুমূর্ষু লোককে ভর্তি করা হয়, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল মুসলমান।’ (রব ১৯৬৪: ৪৫)

এই দাঙ্গার কারণ অনুসন্ধান করিবার জন্য ফেডারেল কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার প্যাট্রিক স্পেন্সের নেতৃত্বে হিন্দু ও মুসলমান বিচারপতিগণকে লইয়া যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হইয়াছিল তাহা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের মধ্যে রিপোর্ট দাখিল করিতে পারে নাই। তাই কমিশন বাতিল করা হইয়াছিল। তাই এক হিশাবে ঘটনাটা অমীমাংসিতই রহিয়া গেল। তবে ফলেই বৃক্ষের পরিচয় পাওয়া যায় বলিয়া যে কিংবদন্তি চালু আছে তাহা বৃথা যায় নাই।

আবুল মনসুর আহমদ এবং কামরুদ্দিন আহ্‌মদ উভয়েই মনে করেন মুসলিম লীগ নেতৃত্ব এই দাঙ্গার দায় এড়াইতে পারেন না। আবুল মনসুর আহমদ পরিষ্কার লিখিয়াছেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আমার নিজের বিবেচনায় এর প্রাথমিক দায়িত্ব মুসলিম লীগ-নেতৃত্বের।’ (আহমদ ২০০১: ১৫২)। তিনি ঘটনার দায়দায়িত্ব সোজাসুজি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাঁধেই চাপাইয়াছেন: ‘কায়েদে আযম ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা করিলেন। কিন্তু কোনও কার্যক্রম ঘোষণা করিলেন না।’ ইহা তেমন গুরুতর অভিযোগ নয়। আবুল মনসুর আহমদ মনে করেন, মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দিনের ‘আমাদের সংগ্রাম ভারত সরকারের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুদের বিরুদ্ধে’ প্রভৃতি ঘোষণা সুস্পষ্ট যুদ্ধঘোষণার শামিল। (আহ্‌মদ ২০০১: ১৫৩)

কামরুদ্দিন আহ্‌মদও এই ধারণায় আংশিক সমর্থন যোগাইয়াছেন: ‘৮ই আগস্ট নেহেরু অন্তবর্তী সরকার গঠন করলেন মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে। ১১ই আগস্ট ও ১২ই আগস্ট খাজা নূরুদ্দিন, খাজা নাজিমুদ্দিন ও পাঞ্জাবের রাজা গজনফর আলী বক্তৃতা করলেন যে, তাদের সংগ্রাম ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে এবং দিল্লী সরকারের বিরুদ্ধে। ১৩ তারিখে আবুল হাসিম পরিষ্কার ভাষায় বিবৃতি দিলেন মুসলিম লীগের “প্রত্যক্ষ দিবস” বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যারা দুটো সম্প্রদায়কে বিভক্ত রেখে তাদের রাজত্ব আবার কায়েম করতে চায়।’ (আহ্‌মদ ১৩৮২: ৭২)

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁহার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লিখিয়াছিলেন ১৯৬৬-৬৯ সালে। তখন তিনি রাজবন্দি হিশাবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক । শেখ হাসিনার মন্তব্য পড়িলে মনে হয় এই আত্মজীবনী তিনি একপ্রকার সমাপ্তই করিয়া আনিয়াছিলেন। শেখ হাসিনা লিখিয়াছেন, ‘আত্মজীবনী হিসেবে প্রকাশের ইচ্ছা তাঁর ছিল বলে সে সময়ে টাইপ করতে দেন।’ (হাসিনা ২০১২: xiii) এই আত্মজীবনীতে তিনি মাত্র ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত পৌঁছিয়াছিলেন। তাই ইহাকে অসমাপ্ত বলা যাইতেই পারে। অবশ্য বাংলায় যাহা ‘আত্মজীবনী’ তাহা ইংরেজি বা ফরাশিতে কেন ‘স্মৃতিকথা’ (Memoirs এবং Mémoires) হইল তাহা বুঝিতে আমার একটু বেগই পাইয়াছে। এই দুইটা ভাষায় তো ‘আত্মজীবনী’ কথাটার প্রতিশব্দ সহজেই পাওয়া যায়। (রহমান ২০১২ [খ]; রহমান ২০১৭)

শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ হইতে স্পষ্ট হয় যে তিনি আবুল মনসুর আহমদ কিংবা কামরুদ্দীন আহ্মদের সঙ্গে একমত নহেন। পক্ষান্তরে তাঁহার ঝোঁক জিন্নাহ সাহেব, আবুল হাশিম, আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকেই। শেখ মুজিব নিশ্চিত ছিলেন যে এই দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটাইয়াছিল হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলগুলি। তাঁহার কথায়, ‘জিন্নাহ সাহেব ১৬ আগস্ট তারিখে “ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে” ঘোষণা করলেন। তিনি বিবৃতির মারফত ঘোষণা করেছিলেন, শান্তিপূর্ণভাবে এই দিবস পালন করতে। ব্রিটিশ সরকার ও ক্যাবিনেট মিশনকে তিনি এটা দেখাতে চেয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষের দশ কোটি মুসলমান পাকিস্তান দাবি আদায় করতে বদ্ধপরিকর। কোনো রকম বাধাই তারা মানবে না। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা এই “প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস”, তাদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয়েছে বলে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৩)

তিনি আরও লিখিয়াছেন, ‘অন্য কোন কথা নাই, “পাকিস্তান” আমাদের দাবি। এই দাবি হিন্দুর বিরুদ্ধে নয়। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। ফরোয়ার্ড ব্লকের কিছু নেতা আমাদের বক্তৃতা ও বিবৃতি শুনে মুসলিম লীগ অফিসে এলেন এবং এই দিনটা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে হিন্দু মুসলমান এক হয়ে পালন করা যায় তার প্রস্তাব দিলেন। আমরা রাজি হলাম। কিন্তু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রপাগান্ডার কাছে তারা টিকতে পারল না। হিন্দু সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দিল এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে। … সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনিও বলে দিলেন, “শান্তিপূর্ণভাবে যেন এই দিনটা পালন করা হয়। কোনো গোলমাল হলে মুসলিম লীগ সরকারের বদনাম হবে।” তিনি ১৬ই আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেন। এতে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা আরও ক্ষেপে গেল।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৩)

আবুল মনসুর আহমদ ঘটনাটা একটু আলাদাভাবেই দেখিয়াছেন। তিনি মনে করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হয়ত অশুভ আশংকা করিয়াই সরকারী কর্মচারীদের নিরাপত্তার জন্য আফিস আদালত ছুটি দিয়াছিলেন। পরবর্তী ঘটনায় বোঝাও [বুঝাও] গিয়াছিল যে ঐ দিন ছুটি না থাকিলে উভয় সম্প্রদায়ের অনেক সরকারী কর্মচারীর জীবনহানি ঘটিত। কিন্তু আগে এটা বুঝার উপায় ছিল না। সরকারী ঘোষণায় তা বলাও হয় নাই। হইলেও হিন্দুরা বিশ্বাস করিত না। মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হইলেই লীগের পার্টি-প্রোগ্রামকে সরকারী ছুটির দিন গণ্য করা হইবে, এটা কোনও যুক্তির কথা নয়। কংগ্রেস মন্ত্রিসভারা তা করেনও নাই। কাজেই হিন্দুরা খুব ন্যায়- ও যুক্তি-সঙ্গত ভাবেই এই আশংকা করিল যে মুসলিম লীগ ঘোষিত হরতাল পালনে হিন্দুদিগকে বাধ্য করা হইবে। নিতান্ত স্বাভাবিকভাবে হিন্দুরা আগে হইতেই প্রস্তুত ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া গেল ঘটনার দিনে।’ (আহমদ ২০০১: ১৫৩)

আবুল মনসুর আহমদ

শেখ মুজিবুর রহমান যাহা সহজ কথায়, সরল বিশ্বাসে, বলিয়াছেন তাহার প্রমাণ অন্যান্য দলিলেও মিলিবে। সোহ্‌রাওয়ার্দী চরিতকার এএসএম আবদুর রব লিখিয়াছেন, ‘হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও খবরের কাগজগুলি লীগের প্রত্যক্ষ কর্মপন্থায় অহেতুক সন্দেহ ও বিদ্বেষ পোষণ করিত। তাই ১৬ই আগষ্টের জনসভা যাহাতে সাফল্যমণ্ডিত না হয়, তাহার জন্য তাহাদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।’ (রব ১৯৬৪: ৪৩)

প্রমাণস্বরূপ তিনি নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার সেক্রেটারী সতীশ চন্দ্র লাহিড়ী প্রভৃতি হিন্দু নেতাদের নামে প্রচারিত প্রচারপত্র হইতে কিয়দংশ উদ্ধার করিয়াছেন: ‘হিন্দুদিগকে লীগের এই স্বেচ্ছাচারিতার উপযুক্ত জবাব দিতেই হইবে। প্রত্যেকটি হিন্দুর নিজ নিজ কাজ করিয়া যাওয়াই ঐ দিন কর্তব্য হইবে এবং কোন হিন্দু, অমুসলমান কিংবা লীগ বিরোধী মুসলমান হরতাল পালন করিবে না, কিংবা কাহাকেও উহা পালন করিতে দিবে না এবং হরতাল রোধ করার জন্য তাহাদের সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করিতে হইবে। সর্বসাধারণের কাছে আমাদের আবেদন—তাহারা যেন ঐ দিন নিজ নিজ স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাইয়া যান এবং মাথা অবনত না করিয়া জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ান। মনে রাখিবেন, হরতাল পালন করার অর্থ পাকিস্তানের দাবী মানিয়া নেওয়া।’ (রব ১৯৬৪: ৪৩-৪৪; তর্জমা এএসএম আবদুর রবের)

 

শেখ মুজিবুর রহমান বিরচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের একটি প্রশংসনীয় পর্যালোচনা লিখিয়াছেন নতুন যুগের যশস্বী ইতিহাস ব্যবসায়ী দীপেশ চক্রবর্তী। তাঁহার চোখে ধরা পড়িয়াছে: ‘বঙ্গবন্ধুর চোখে, জনজীবনের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে আদর্শ পুরুষ ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি বা তাঁর ভাষায় “শহীদ সাহেব”।’ তিনি একটু পরেই, পুনরাবৃত্তিক্রমে, লিখিয়াছেন: ‘বঙ্গবন্ধুর কাছে সত্যিই যিনি আদর্শপুরুষ, তিনি শহীদ সাহেব, যিনি [যাঁহাকে] তাঁর রাজনৈতিক গুরুও বলা যায়। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথায় তিনিই নায়ক। দেশভাগের ইতিহাসবিদ মাত্রেই শহীদ সাহেবের এই ছবিতে আগ্রহী হবেন।’ (চক্রবর্তী ২০১৮: ১৪০-১৪১)

কিন্তু কেন? কারণটা চক্রবর্তী বিশদও করিয়াছেন: ‘বাঙাল-বাড়িতে, ১৯৪৬-এর দাঙ্গা ও দেশভাগের ছায়ায় বড়ো হয়ে আমি শহীদ সাহেবের নিন্দাই শুনেছি। পরবর্তীকালে চটকল শ্রমিকদের ইতিহাস গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি কীভাবে ব্রিটিশ মিল মালিকের সহায়তা নিয়ে কমিউনিস্ট শ্রমিক ইউনিয়ন ব্যর্থ করার চেষ্টা করেছেন শহীদ সাহেবের সঙ্গীরা (আমার Rethinking Working-Class History: Bengal, 1890-1940 দ্রষ্টব্য)। তা ছাড়া নিউ মার্কেটের ফলের ব্যবসায়ী “কুখ্যাত” মীনা পেশোয়ারির সঙ্গে শহীদ সাহেবের দহরম-মহরমের কথা শুনেছি। ৪৬-এর দাঙ্গার হিন্দু-স্মৃতিও অনেক সময় শহীদ সাহেবকে দায়ী করেছে।’ (চক্রবর্তী ২০১৮: ১৪১)

শুদ্ধমাত্র ‘হিন্দু-স্মৃতি’ নহে, ইংরেজ-স্মৃতিও সোহরাওয়ার্দীর কম নিকুচি করে নাই। ইংরেজ সাংবাদিক বেগম টায়া জিনকিন ১৯৬২ সালে পৌঁছিয়া পর্যন্ত নিঃসংশয়ে লিখিতে দ্বিধা করেন নাই যে এই দাঙ্গার জন্য প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীই দায়ী। কারণ তিনিই ইহার সূচনা করিয়াছিলেন। জিনকিন লিখিয়াছেন: ‘পুরা বাংলাদেশের দায়িত্বে ছিল একটি মুসলমান মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী—যিনি ছিলেন জিন্নাহর পৃথক মুসলমান রাষ্ট্রস্বরূপ পাকিস্তান দাবির নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক—খোলাখুলি খুনখারাবির উস্কানি দিয়াছিলেন। ভারতের উত্তরাঞ্চল হইতে সশস্ত্র ডাকাত আমদানি করিয়াছিলেন তিনি আর কলিকাতার রাস্তাঘাটে তাহাদিগকে লেলাইয়াও দিয়াছিলেন; সেখানে তাহারা শিখ আর হিন্দুদের উপর আক্রমণ করে অথচ পুলিশ নির্বিকার দাঁড়াইয়া ছিল। শিখ আর হিন্দুদের গোছাইয়া লইতে আর প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে কয়েকদিন লাগিয়া যায়। সপ্তাহের শেষ নাগাদ কলিকাতায় ২০,০০০ হইতে ৩০,০০০ লোক মৃত্যুবরণ করে; মুসলমানপক্ষে নিহত ও আহতের সংখ্যা একটু বেশি ভারি ছিল।’ (জিনকিন ১৯৬২: ১৫)

সহজেই অনুমান করা যায়, সাংবাদিকতা কেন এমন বিপদসংকুল পেশা। এহেন শাদা-কালো রায় সাংবাদিককেই মানায়, বিশেষ তাহাতে যদি জাতিগত অহমিকার অনুপানও মিশিয়া থাকে। একটু খেয়াল করিলেই স্পষ্ট হয়, এই বিবরণটা তপন রায়চৌধুরীর বিবরণের সহিত মেলে না।

মওলানা আবুল কালাম আজাদও মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার নিন্দা বেশ করিয়াছিলেন। তাঁহার দোহাই দিয়া বড়লাট ওয়াবেল আপনকার ১৯ আগস্ট তারিখের রোজনামচায় টুকিয়াছিলেন: ‘কলিকাতার দাঙ্গা আর মন্ত্রিসভার বিষয় লইয়া বিকালে (মওলানা আবুল কালাম) আজাদের সঙ্গে একঘণ্টা আলাপ করিলাম। তিনি কঠোর ভাষায় বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার নিন্দা করিলেন আর বলিলেন যে তাঁহারা যদিও আগেভাগেই গণ্ডগোলের আভাস পাইয়াছিলেন তথাপি যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেন নাই; তদুপরি পূর্ণ সান্ধ্য আইন কার্যকর করিতে অনেক দেরি করিয়া ফেলিয়াছিলেন, অধিক কি, হাতে তাঁহারা যথেষ্ট সময় থাকিতে সেনাবাহিনী নামান নাই।’ (মেহরা ১৯৮৫: ১৯৭)

মওলানা আজাদ মূল ঘটনার মাত্র ১২ বছর পর—মোতাবেক ১৯৫৮ সালে—প্রকাশিত স্মৃতিকথায়ও একই নালিশ পেশ করিতেছিলেন। অনেক আজাদভক্ত আমার সহিত একমত পোষণ করিবেন না, তবে আমার ধারণা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নিশানা করিয়াই আজাদ এই কথাগুলি লিখিয়াছিলেন: ‘ভারতবর্ষের ইতিহাসে নজিরবিহীন এই গণহারে খুনখারাবির কারণে কলিকাতা মহানগরী রক্তপাত, খুন, আর সন্ত্রাসের শিহরণে ডুবিয়া গিয়াছিল। শত শত মানুষ জীবন হারাইয়াছিল। হাজার হাজার মানুষ জখম হইয়াছিল আর কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হইয়াছিল। লীগ অনেক মিছিল নামাইয়াছিল যেগুলি লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের কাজ শুরু করে। বেশিক্ষণ না যাইতেই গোটা মহানগরী দুই সম্প্রদায়ের গুন্ডাদের দখলে চলিয়া যায়।’ (আজাদ ১৯৮৮: ১৬৯)

এক্ষণে বঙ্গবন্ধুর জবানবন্দি পড়িবার পর দীপেশ চক্রবর্তীর নতুন উপলব্ধি: ‘বঙ্গবন্ধুর ও অন্যান্য মুসলিম-বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতার স্মৃতি শহীদ সাহেবকে অন্য আলোতে দেখায়। আজ হয়তো আমাদের সময় এসেছে এই ঐতিহাসিক মানুষটিকে পুনর্বিবেচনা করার। তাঁর মূল্যায়নেও বঙ্গবন্ধুর এই অসমাপ্ত গ্রন্থটি আমাদের খুবই সাহায্য করবে।’ (চক্রবর্তী ২০১৮: ১৪১)

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমান, ১৯৪৯

দীপেশ চক্রবর্তী যাহাদিগকে ‘অন্যান্য মুসলিম-বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা’ আখ্যা দিয়াছেন আবুল মনসুর আহমদকেও তাঁহাদের মধ্যে গণ্য করা যায়। দাঙ্গার আশু ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি লিখিয়াছেন: ‘কলিকাতায় স্বভাবতই হিন্দুর চেয়ে মুসলমানের জান-মালের ক্ষতি হইয়াছিল অনেক বেশী। এই খবর অতিরঞ্জিত আকারে পূর্ব বাংলায় পৌঁছিলে নোয়াখালি জিলায় হিন্দুরা নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়। তারই প্রতিক্রিয়ায় বিহারের হিন্দুরা তথাকার মুসলমানদিগকে অধিকতর নৃশংসতার সাথে পাইকারীভাবে হত্যা করে। ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ব্যাপারে বাংলা-বিহার একই যুদ্ধ-ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই যুদ্ধ চলে প্রায় চার মাস ধরিয়া। উভয় পক্ষে কত লোক যে হতাহত হয় কত কোটি টাকার সম্পত্তি যে ধ্বংস হইয়াছিল তার লেখা-জোখা নাই। পরবর্তীকালে দেশ ভাগের সময়ে অবশ্য আরও বহু প্রদেশে দানবীয় নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়াছিল। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত বাংলা-বিহারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাই নৃশংস অমানুষিকতার সর্বাপেক্ষা লজ্জাকর নিদর্শন।’ (আহমদ ২০০১: ১৫৪)

আবুল মনসুর আহমদ কলিকাতা দাঙ্গার উপসংহার করিয়াছেন এইভাবে: ‘অনেক অতি-সাম্প্রদায়িক মুসলমান আজও  সগর্বে বলিয়া থাকে কলিকাতা দাঙ্গাই পাকিস্তান আনিয়াছিল। এ কথা নিতান্ত মিথ্যা নয়। এই দাঙ্গার পরে ইংরাজ-হিন্দু-মুসলমান তিনপক্ষেই বুঝিতে পারেন, দেশ বিভাগ ছাড়া উপায়ান্তর নাই।’ (আহমদ ২০০১: ১৫৪)

দাঙ্গার সুদূরপ্রসারী ফলাফল কাহারও চোখে ‘পাকিস্তান’, কাহারও বা চোখে ‘দেশ বিভাগ’, আর অনেকের চোখে ঘটনার পরিণতি শুদ্ধ দেশের বিভাগ মাত্র নহে, ‘স্মৃতির বিভাগও’ বটে। দীপেশ চক্রবর্তীর উক্তি অবিস্মরণীয়: ‘মনে হয় কলকাতা তথা বাংলায় শহীদ সাহেবের স্মৃতিও যেন হিন্দু-মুসলমান দেশভাগের মতোই ভিন্নভিন্নভাবে ভাগ করে নিয়েছে দুই সম্প্রদায়।’ (চক্রবর্তী ২০১৮: ১৪১)

দাঙ্গার কারণও এইভাবে দ্বিধাবিভক্ত হইয়াছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশের বছর পাঁচেক আগে ছাপা বাঙালনামা গ্রন্থে ‘বরিশালের বাঙাল’ তপন রায়চৌধুরী সবিস্তার লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন: ‘হিন্দুদের মধ্যে অনেকেরই বিশ্বাস সরওয়ার্দি [একটু পরে তিনি আবার লিখিবেন ‘সুরাবর্দি’] সাহেবের আশ্রয়ে মুসলিম লিগ দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। তেমনি অনেক মুসলমান বলতেন—হিন্দুরাই তাঁদের উপর হামলা করার জন্য অনেকদিন ধরে তৈরি হচ্ছিল। না হলে ময়দানের সভা থেকে মুসলমানরা যখন ফিরছে তখন হাওড়া পুলের উপর তারা সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হল কী করে?’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫০)

হাওড়া পুলের উপর কি হইয়াছিল? তাহার একটি বিবরণ পাওয়া যাইতেছে গোপাল গোস্বামীর স্মৃতিকথায়: ‘১৬ আগস্ট ছিল শুক্রবার। কিন্তু ১৭ আগস্ট শনিবার অবস্থা কিছুটা পাল্টাতে শুরু করল। হিন্দুরা অ্যালার্ট হয়ে গেল। হিন্দু এবং পাঞ্জাবিরা মিলে ব্রিজ বন্ধ করে দিল, যাতে বাইরে থেকে দুষ্কৃতিরা শহরে ঢুকতে না পারে। এর পর শুরু হল মুসলমানদের উপর হিন্দুদের প্রত্যাঘাত। এতে আনুমানিক প্রায় চারশো মুসলমান মারা পড়েছিল। এর আগে অবশ্য মুসলমান দুষ্কৃতির আক্রমণে এই হাওড়াতেই হিন্দুদের লাশের পাহাড় জমে গিয়েছিল।  কোয়ার্টারের প্রহরীরা বেশির ভাগই হিন্দু হওয়ায় মুসলমান দুষ্কৃতিদের খোঁজে হাতে ডাণ্ডা নিয়ে তাদের ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হিন্দুদের হাতে সে দিন অনেক নিরীহ মুসলমানের প্রাণ গিয়েছিল।’ (গোস্বামী ২০১৬: ১৮৬)

শেখ মুজিব লিখিয়াছেন: ‘মুসলমানরা মোটেই দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত ছিল না, একথা আমি বলতে পারি।’ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিবার আগে তিনি ১৬ আগস্টের বিবরণ সকাল সাতটা হইতে শুরু করিয়াছেন।

প্রথম ঘটনা ১৬ আগস্ট সকালবেলার। শেখ মুজিব লিখিয়াছেন: ‘১৫ই আগস্ট কে কোথায়, কোন এরিয়ায় থাকবে ঠিক হয়ে গেল। ১৬ই আগস্ট কলকাতার গড়ের মাঠে সভা হবে। সমস্ত এরিয়া থেকে শোভাযাত্রা করে জনসাধারণ আসবে। কলকাতার মুসলমান ছাত্ররা ইসলামিয়া কলেজে সকাল দশটায় জড়ো হবে। আমার উপর ভার দেওয়া হল ইসলামিয়া কলেজে থাকতে। শুধু সকাল সাতটায় আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলিত করতে। আমি ও নূরুদ্দিন সাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হলাম। পতাকা উত্তোলন করলাম। কেউই আমাদের বাধা দিল না। আমরা চলে আসার পরে পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল শুনেছিলাম।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৩)

দ্বিতীয় ঘটনা: ‘আমরা কলেজ স্ট্রিট থেকে বউবাজার হয়ে আবার ইসলামিয়া কলেজে ফিরে এলাম। কলেজের দরজা ও হল খুলে দিলাম। আর যদি আধা ঘন্টা দেরি করে আমরা বউবাজার হয়ে আসতাম তবে আমার ও নূরুদ্দিনের লাশ আর কেউ খুঁজে পেত না। ভাবসাব যে খারাপ আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যখন ফিরে আসি।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৩-৬৪)

তৃতীয় ঘটনা: ‘বেকার হোস্টেল থেকে মাত্র কয়েকজন কর্মী এসে পৌঁছেছে। আমি ওদের সভাকক্ষ খুলে টেবিল চেয়ার ঠিক করতে বললাম। কয়েকজন মুসলিম ছাত্রী মন্নুজান হোস্টেল থেকে ইসলামিয়া কলেজে এসে পৌঁছেছেন।… এরা ইসলামিয়া কলেজে পৌঁছার কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখা গেল কয়েকজন ছাত্র রক্তাক্ত দেহে কোনোমতে ছুটে এসে ইসলামিয়া কলেজে পৌঁছেছে। কারো পিঠে ছোরার আঘাত, কারও মাথা ফেটে গেছে। কি যে করব কিছুই বুঝতে পারছি না। কারণ, এ জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৪)

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি বেকার হোস্টেলে থাকতেন

চতুর্থ ঘটনা: ‘ইসলামিয়া কলেজের কাছেই সুরেন ব্যানার্জি রোড, তারপরেই ধর্মতলা ও ওয়েলিংটন স্কয়ারের জংশন। এখানে সকলেই প্রায় হিন্দু বাসিন্দা। আমাদের কাছে খবর এল, ওয়েলিংটন স্কয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে। কয়েকজন ছাত্রকে ছাত্রীদের কাছে রেখে, আমরা চল্লিশ পঞ্চাশজন ছাত্র প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত গেলাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভাল ছিল না। দেখি শত শত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মসজিদ আক্রমণ করছে। মৌলভী সাহেব পালিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। তাঁর পিছু ছুটে আসছে একদল লোক লাঠি ও তলোয়ার হাতে। পাশেই মুসলমানদের কয়েকটা দোকান ছিল। কয়েকজন লোক কিছু লাঠি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াল। আমাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ দিতে শুরু করল। দেখতে দেখতে অনেক লোক জমা হয়ে গেল। হিন্দুরা আমাদের সামনা সামনি এসে পড়েছে। বাধা দেওয়া ছাড়া উপায় নাই। ইঁট [ইট] পাটকেল যে যা পেল তাই নিয়ে আক্রমণের মোকাবেলা করে গেল। আমরা সব মিলে দেড়শত লোকের বেশি হব না। কে যেন পিছন থেকে এসে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের কয়েকখানা লাঠি দিল। এর পূর্বে শুধু ইঁট [ইট] দিয়ে মারামারি চলছিল। এর মধ্যে বিরাট একটা শোভাযাত্রা এসে পৌঁছাল। এদের কয়েক জায়গায় বাধা দিয়েছে, রুখতে পারে নাই। তাদের সকলের হাতেই লাঠি। এরা এসে আমাদের সঙ্গে যোগদান করল। কয়েক মিনিটের জন্য হিন্দুরা ফিরে গেল, আমরাও ফিরে এলাম। পুলিশ কয়েকবার এসে এর মধ্যে কাঁদানে গ্যাস ছেড়ে চলে গেছে। পুলিশ টহল দিচ্ছে, এখন সমস্ত কলকাতায় হাতাহাতি মারামারি চলছে।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৪-৬৫)

 

প্রথম দিনের দাঙ্গার দ্বিতীয় অঙ্ক গড়ের মাঠে সভা শেষ হইবার পরে। শেখ সাহেব লিখিতেছেন: ‘আমরা রওয়ানা করলাম গড়ের মাঠের দিকে। এমনিই আমাদের দেরি হয়ে গেছে। লাখ লাখ লোক সভায় উপস্থিত। কালীঘাট, ভবানীপুর, হ্যারিসন রোড, বড়বাজার সকল জায়গায় শোভাযাত্রার উপর আক্রমণ হয়েছে। শহীদ সাহেব বক্তৃতা করলেন এবং তাড়াতাড়ি সকলকে বাড়ি ফিরে যেতে হুকুম দিলেন। কিন্তু যাদের বাড়ি বা মহল্লা হিন্দু এরিয়ার মধ্যে তারা কোথায় যাবে?’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৫)

শেখ সাহেবের জবানবন্দি আরও একটু তুলিতে হয়: ‘মুসলিম লীগ অফিস লোকে লোকারণ্য। কলকাতা সিটি মুসলিম লীগ অফিসেরও একই অবস্থা। বহু লোক জাকারিয়া স্ট্রিটে চলে গেল। ওয়েলেসলী, পার্ক সার্কাস, বেনিয়া পুকুর এরিয়া মুসলমানদের এরিয়া বলা চলে। বহু জখম হওয়া লোক এসে গেছে; তাদের পাঠাতে হয়েছে মেডিকেল কলেজ, ক্যাম্বেল ও ইসলামিক হসপিটালে। মিনিটে মিনিটে টেলিফোন আসছে, শুধু একই কথা, “আমাদের বাঁচাও, আমরা আটকা পড়ে আছি। রাতেই আমরা ছেলেমেয়ে নিয়ে শেষ হয়ে যাব।”’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৫)

এই অপ্রস্তুত অবস্থার অতিরিক্ত প্রমাণ নীচের ঘটনায়। এখানে শেখ সাহেব যাহা জানাইতেছেন তাহা একটু আগেও উদ্ধৃত করিয়াছি: ‘আমি নিজেও খুব চিন্তাযুক্ত ছিলাম। কারণ, আমরা ছয় ভাইবোনের মধ্যে পাঁচজনই তখন কলকাতা ও শ্রীরামপুরে। আমার মেজোবোনের জন্য চিন্তা নাই, কারণ সে বেনিয়া পুকুরে আছে। সেখানে এক বোন বেড়াতে এসেছে। এক বোন শ্রীরামপুরে ছিল। একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের ম্যাট্রিক পড়ে। একেবারে ছেলেমানুষ। একবার মেজো জনের বাড়ি, একবার আমার ছোটবোনের বাড়ি এবং মাঝে মাঝে আমার কাছে বেড়িয়ে বেড়ায়। কারো কথা বেশি শোনে না। খুবই দুষ্ট ছিল ছোটবেলায়। নিশ্চয়ই গড়ের মাঠে এসেছিল। আমার কাছে ফিরে আসে নাই। বেঁচে আছে কি না কে জানে! শ্রীরামপুরের অবস্থা খুবই খারাপ। যে পাড়ায় আমার বোন থাকে, সে পাড়ায় মাত্র দুইটা ফ্যামিলি মুসলমান।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৫-৬৬)

শেখ সাহেবের ছোটভাইটি সেইদিন ভাগ্যক্রমে বাঁচিয়া গিয়াছিলেন। তাহার সামান্য বিবরণ: ‘নাসের কলকাতায় এসেছিল ১৬ই আগস্ট। হ্যারিসন রোডে এসে বিপদে পড়ে। তারপর একটা এ্যাম্বুলেন্স গাড়িতে উঠে জীবনটা বাঁচায়। নাসেরের একটা পা ছোটকালে টাইফয়েড হয়ে খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল। পা টেনে টেনে হাঁটতে হয়। সেই পা দেখিয়ে এ্যাম্বুলেন্সে উঠে পড়ে। দিনভর এ্যাম্বুলেন্সে থাকে, সন্ধ্যায় হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠে শ্রীরামপুর যায়। ট্রেনে তিন ঘণ্টা লাগে। কয়েকবার ট্রেনে আক্রমণ হয়েছে। কোনোমতে বেঁচে গিয়েছে।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৭)

শেখ মুজিবুর রহমান

উদ্ধৃতির পরিমাণ একটু বেশিই হইল। ঘোড়ার মুখ হইতে এই পর্যন্ত শুনিলে কি মনে হয় যাঁহারা বলিয়াছিলেন ‘মুসলিম লিগ সংগ্রাম বলতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কথাই চিন্তা করেছিল’ তাঁহারা সত্যকথা বলিয়াছিলেন? তপন রায়চৌধুরী লিখিতেছেন, ‘অপর পক্ষে ভারতবর্ষে রয়ে গেছেন এরকম কিছু প্রগতিশীল মুসলমানদের মুখে শুনেছি যে, তাঁদের সপরিবারে ময়দানের সভায় যেতে বলা হয়েছিল এবং অনেকে তাই গিয়েছিলেন। যদি দাঙ্গা বাঁধানোর মতলব নিয়েই লিগ মন্ত্রিসভা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনে উদ্যোগী হয়ে থাকে, তা হলে কি তারা [তাঁরা] মুসলমান মেয়ে এবং বালক-বালিকাদের জীবন বিপন্ন করত?’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫০)

আবুল হাশিম দেশভাগের পর বেশিদিন ভারতবর্ষে থাকিতে পারেন নাই, তাঁহাকেও অনেকে ‘প্রগতিশীল মুসলমানদের’ মধ্যে গণ্য করেন। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ‘ফিরিয়া দেখা’ নামক স্মৃতিকথায় তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘মানুষ মিথ্যা বলিতে পারে, কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতি কদাচ মিথ্যা বলে না। এই উপলক্ষে কলিকাতায় যে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হইবে বলিয়া আশা করা হইতেছিল তাহা দেখাইব বলিয়া আমি আমার সঙ্গে আমার দুই পুত্র—১৫ বছরের বালক বদরুদ্দিন মোহাম্মদ উমর এবং ৮ বছরের বালক শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ আলী—কে বর্ধমান হইতে লইয়া আসিয়াছিলাম। আমার পুত্রদের আমি ময়দানে লইয়া গিয়াছিলাম আর ফরিদপুরের লাল মিয়া তাঁহার ছয় কি সাত বছর বয়সের নাতিকেও সঙ্গে লইয়াছিলেন। আমরা যদি কোন প্রকারের বিপদের আভাস পাইতাম তো আমাদের পুত্র আর নাতিদের ময়দানে লইয়া যাইতাম না।’ (হাশিম ১৯৭৪: ১১৬)

তপন রায়চৌধুরী প্রতিথযশা ইতিহাস ব্যবসায়ী। মহাফেজখানায় কারবার করিবার অভিজ্ঞতা তাঁহার আছে। তিনি এখনও আশা করিতেছেন সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হইবেই। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে মামলাটা অবশ্য তুলিয়া লইতে রাজি নহেন তিনি: ‘লিগ সরকারের কুমতলবের প্রমাণস্বরূপ বলা হয় যে, দাঙ্গা শুরু হওয়ার অল্প ক’দিন আগে সুরাবর্দি [একটু আগে তিনি বানানটা অবশ্য লিখিয়াছিলেন ‘সরওয়ার্দি’] সাহেব কলিকাতার পুলিশি ব্যবস্থা আগাগোড়া বদলে দেন। এ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাঁরা কিন্তু প্রচলিত গুজবের সপক্ষে কিছু লেখেননি। লেখার অসুবিধেও আছে। এ সময়কার পুলিশ দফতরের কাগজপত্র সত্যিতে এখনও গবেষকের কাছে অধিগম্য নয়। আর যদি আপত্তিজনক কোনও আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তার নজির রেখে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে পুলিশি কাগজপত্র গবেষকদের দেখতে দেওয়া হলে হঠাৎ লিগের পেয়ারের লোকদের মোক্ষম সব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একথা সত্য কি না তা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হতে পারে। তবে কলকাতার পুলিশে হঠাৎ উঁচু পদে দুই মুসলমান কর্মচারীকে বহাল করা হয়—একথা অনেকের মনে আছে।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫১)

এই কথাটাও অন্য কোন গুজব কিনা তাহা বিচার করার আবশ্যক আছে—এমন অবশ্য মনে করেন নাই রায়চৌধুরী। খানিক আগে তিনি অকপট হইয়া কবুল করিয়াছিলেন গুজব গুজবই: ‘যা হোক, আগস্ট মাসের গোড়া থেকেই শহরে নানা গুজব ছড়াতে থাকে। দাঙ্গা নাকি হবেই। শোনা গেল লিগের পক্ষ থেকে গুন্ডাদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনও কোনও অঞ্চলে হিন্দুদের বাড়ি আক্রমণের জন্য নির্দেশ দিয়ে হ্যান্ডবিল বিলি হয়েছে। রাজাবাজার এবং অন্যান্য মুসলমানপ্রধান পাড়ায় রোজ সন্ধ্যায় নাকি ট্রাকে করে লিগের প্রচারকরা দাঙ্গা করার জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু অস্ত্রশস্ত্রও বিলি হয়েছে। এইসব গুজব নিয়ে কলকাতার রক এবং চায়ের দোকানের আড্ডা তখন সরগরম ঠিকই, লোকের মুখে অন্য কোনও কথা নেই, কিন্তু একটা কারণে আমার ধারণা যে, হুজুগপ্রিয় কলকাতাবাসী তাদের নিজেদেরই ছড়ানো গুজব খুব একটা বিশ্বাস করেনি।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫০)

ভবিষ্যতের বঙ্গবন্ধু সেদিনের তরুণ শেখ মুজিব ঘটনার যে প্রত্যক্ষ বিবরণ লিখিয়াছেন তাহাও প্রমাণ করে না যে গুজব গুজব নয়: ‘লীগ অফিস রিফিউজি ক্যাম্প হয়ে গেছে, ইসলামিয়া কলেজও খুলে দেওয়া হয়েছে। কলকাতা মাদ্রাসা যখন খুলতে যাই, তখন দারোয়ান কিছুতেই খুলতে চাইছে না। আমি দৌড়ে প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছে গেলে তিনি নিজেই এসে হুকুম দিলেন দরজা খুলে দিতে। আশেপাশে থেকে কিছু লোক কিছু কিছু খবর দিতে লাগল। বেকার হোস্টেল, ইলিয়ট হোস্টেল পূর্বেই ভরে গেছে। এখন চিন্তা ছিল টেইলর হোস্টেলের ছেলেদের কি করে বাঁচাই।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৫)

পুনশ্চ উবাচ শেখ মুজিব: ‘লেডী ব্রাবোর্ন কলেজে রিফিউজিদের থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। দোতলায় মেয়েরা, আর নিচে [নীচে] পুরুষরা। কর্মীদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আমাকেও মাঝে মাঝে থাকতে হয়। মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু’এক জায়গায় উদ্ধার করতে যেয়ে [গিয়ে] আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদেরও উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি। মনে হয়েছে মানুষ তার মানবতা হারিয়ে পশুতে পরিণত হয়েছে। প্রথম দিন ১৬ই আগস্ট মুসলমানরা ভীষণভাবে মার খেয়েছে। পরের দুইদিন মুসলমানরা হিন্দুদের ভীষণভাবে মেরেছে। পরে হাসপাতালের হিসাবে সেটা দেখা গিয়েছে।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৬)

আবুল কালাম শামসুদ্দীনের স্মৃতিকথায়ও একই ধারণার আবর্তন: ‘১৬ই আগস্ট থেকে ১৯ই আগস্ট পর্যন্ত এই চারদিন কলকাতার বুকে যে নারকীয় কাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়, সাম্প্রদায়িক কারণে আকস্মিক ও বেপরোয়া নরহত্যার ইতিহাসে তার নজীর খুব কমই মিলবে। আকস্মিকভাবে মার খেয়ে অবশ্য মুসলমানরাও পরে প্রতিশোধ গ্রহণে তৎপর হয়ে উঠেছিলো এবং এ জঘন্য পাপানুষ্ঠানে তাদের হস্তও কম কলুষিত হয় নাই। তবে এ নারকীয় কাজের সূচনা তারা করে নাই—তার প্রমাণ হাসপাতালের রিপোর্টেই দেখা গেছে। প্রথম দু’দিন মৃত্যু [মৃত্যুর] ও আহত হওয়ার হার তাদের মধ্যেই ছিলো অনেক বেশী। তবে পরবর্তী দু’দিনে এ হার উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রায় সমান সমান হয়ে উঠেছিলো।’ (শামসুদ্দীন ১৯৯৪: ৪০৬)

এখানে আবারও মনে করাইয়া দিতেছি, মূল ঘটনার ১৬ বছর পর—১৯৬২ সাল নাগাদ—ইংরেজ সাংবাদিক টায়া জিনকিন ঘটনার ষোল আনা উল্টো বিবরণই পেশ করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, হিন্দু ও শিখরা আগেভাগে আক্রমণ করে নাই, পরে মাত্র প্রতিশোধ লইয়াছিল।

বড়লাট লর্ড আর্চিবল্ড পার্সিবল ওয়াবেলের রোচনামচায়ও এই বহুল আলোচিত তথ্যের পক্ষে পরোক্ষ সমর্থন আর বিবরণের সহিত বিশ্লেষণের বিরোধাভাস পাওয়া যাইতেছে। ১৯৪৬ সালের ১৮ আগস্ট তারিখে লর্ড ওয়াবেল তদীয় রোজনামচায় টুকিয়াছিলেন: ‘কলিকাতা জায়গাটা যতটা খারাপ হইতে পারে ততটাই খারাপ অবস্থায় চলিয়া গিয়াছে আর মৃত্যুর হিশাবটা অনবরত বাড়িয়াই যাইতেছে। শরৎচন্দ্র বসু বিকালে টেলিফোন করিয়া প্রতিবাদ জ্ঞাপন করিলেন যে পুলিশ হিন্দুদিগের ক্ষতি করিয়া মুসলমানদিগের দিকে পক্ষপাত করিতেছে; এদিকে আবার গবর্নর সাহেব আমাকে বলিতেছেন যে নিহত আর আহতের সংখ্যা মুসলমান পক্ষেই অধিক। সে যাহাই হোক, ঘটনা আদ্যোপান্তই খারাপ।’ (মেহরা ১৯৮৫: ১৯৭)

হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর জীবনচরিত লেখক লিখিয়াছেন, ‘কলিকাতার দাঙ্গায় শুধু সরকারী হিসাবেই ৫০০০ হাজার নিহত, ১৫০০০ হাজার আহত, এক লক্ষ গৃহহীন ও বহু কোটী টাকার সম্পত্তি নষ্ট হইয়াছিল। এই হাঙ্গামায় সবচেয়ে লজ্জাকর দৃশ্য ইহাই দেখা গিয়াছিল যে, হিন্দু পাড়ায় শিক্ষিত হিন্দুরা—এমন কি ছাত্ররাও—দাঙ্গা-হাঙ্গামায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করিয়াছে। মুসলমান পাড়ায় কিন্তু কোন শিক্ষিত মুসলমানকে দাঙ্গায় অংশ গ্রহণ করিতে দেখা যায় নাই।’ (রব ১৯৬৪: ৪৪)

শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত অভিজ্ঞতায় যতটুকু আভাস পাওয়া যায় তাহা  হইতেও বুঝা যায় যে মুসিলম লীগ মন্ত্রিসভাও এই অপূর্ব দাঙ্গার আকস্মিকতায় এবং ব্যাপকতায় অপ্রস্তুত হইয়া গিয়াছিলেন। শেখ সাহেবের কয়েকটি কঠিন অভিজ্ঞতার বিবরণ এখানে উল্লেখ করার মতো।

প্রথম অভিজ্ঞতার দিনতারিখ উল্লেখ করেন নাই তিনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ১৬ আগস্টের দুই কি তিন দিন পরের কথা: ‘এদিকে হোস্টেলগুলিতে চাউল, আটা ফুরিয়ে গিয়েছে। কোন দোকান কেউ খোলে নাই, লুট হয়ে যাবার ভয়েতে। শহীদ সাহেবের কাছে গেলাম। কি করা যায়? শহীদ সাহেব বললেন, “নবাবজাদা নসরুল্লাহকে (ঢাকার নবাব হাবিবুল্লাহ সাহেবের ছোট ভাই, খুব অমায়িক লোক ছিলেন, শহীদ সাহেবের ভক্ত ডেপুটি চিফ হুইপ ছিলেন) ভার দিয়েছি, তার [তাঁর] সাথে দেখা কর।” আমরা তাঁর কাছে ছুটলাম। তিনি আমাদের নিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে গেলেন এবং বললেন, “চাউল এখানে রাখা হয়েছে তোমরা নেবার বন্দোবস্ত কর। আমাদের কাছে গাড়ি নাই। মিলিটারি নিয়ে গিয়েছে প্রায় সমস্ত গাড়ি। তবে দেরি করলে পরে গাড়ির বন্দোবস্ত করা যাবে।” আমরা ঠেলাগাড়ি আনলাম, কিন্তু ঠেলবে কে? আমি, নূরুদ্দিন ও নূরুল হুদা (এখন ডিআইটির ইঞ্জিনিয়ার) এই তিনজনে ঠেলাগাড়িতে চাউল বোঝাই করে ঠেলতে শুরু করলাম। নূরুদ্দিন সাহেব তো “তালপাতার সেপাই”—শরীরে একটুও বল নাই। আমরা তিনজনে ঠেলাগাড়ি করে বেকার হোস্টেল, ইলিয়ট হোস্টেলে চাউল পৌঁছে দিলাম। এখন কারমাইকেল হোস্টেলে কি করে পৌঁছাই? অনেক দূর, হিন্দু মহল্লা পার হয়ে যেতে হবে। ঠেলাগাড়িতে পৌঁছান সম্পূর্ণ অসম্ভব। নূরুদ্দিন চেষ্টা করে একটা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি জোগাড় করে আনল । আমরা তিনজন কিছু চাউল নিয়ে কারমাইকেল হোস্টেলে পৌঁছে ফিরে আসলাম।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৬)

দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটা আরও মর্মান্তিক: ‘একদল লোককে দেখেছি দাঙ্গাহাঙ্গামার ধার ধারে না। দোকান ভাঙছে, লুট করছে, আর কোনো কাজ নাই। একজনকে বাধা দিতে যেয়ে [গিয়ে] বিপদে পড়েছিলাম। আমাকে আক্রমণ করে বসেছিল। কারফিউ জারি হয়েছে, রাতে কোথাও যাবার উপায় নাই। সন্ধ্যার পর কোন লোক রাস্তায় বের হলে আর রক্ষা নাই। কোন কথা নাই, দেখামাত্র শুধু গুলি। মিলিটারি গুলি করে মেরে ফেলে দেয়। এমনকি জানালা খোলা থাকলেও গুলি করে। ভোরবেলা দেখা যেত অনেক লোক রাস্তায় গুলি খেয়ে মরে পড়ে আছে। কোনো কথা নেই শুধু গুলি।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৭)

তৃতীয় অভিজ্ঞতাটা আরো সাংঘাতিক, আরো লোমহর্ষক: ‘একবার আমার ও সিলেটের মোয়াজ্জেম চৌধুরীর (এখন কনভেনশন মুসলিম লীগের এমএলএ) উপর ভার পড়েছে পার্ক সার্কাস ও বালিগঞ্জের মাঝে একটা মুসলমান বস্তি আছে—প্রত্যেক রাতেই হিন্দুরা সেখানে আক্রমণ করে—তাদের পাহারা দেওয়ার জন্য। কারণ বন্দুক চালানোর লোকের নাকি অভাব। আমি ও মোয়াজ্জেম বন্দুক চালাতে পারতাম। আমার [বাবার] ও মোয়াজ্জেমের বাবার বন্দুক ছিল। আমরা গুলি ছুঁড়তে জানতাম। … সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময় খবর এল মিল্লাত অফিস থেকে ঐ এলাকায় যাবার জন্য। আমরা রওয়ানা করে তাড়াতাড়ি ছুটতে লাগলাম, কোন গাড়ি নাই। আমাদের পায়ে হেঁটেই পৌঁছাতে হবে। কেবলমাত্র লোয়ার সার্কুলার রোড পার হয়ে আমরা ছোট রাস্তায় ঢুকেছি, অমনিই কারফিউর সময় হয়ে গেছে। কবরস্থানের পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। গাড়ির শব্দ পেলেই আমরা লুকাই, আবার হাঁটি। অনেক কষ্টে পার্ক সার্কাস ময়দানের পিছনে এলাম। ময়দান পার হই কি করে? অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টার পর ময়দানের পিছন দিয়ে “সওগাত” প্রেসের মালিক ও সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সাহেবের বাড়ির কাছে পৌঁছালাম। সেখান থেকে আর একটা রাস্তা পার হয়ে এক বন্ধুর বাড়িতে ঢুকলাম। কিন্তু এখন কি করি? বন্ধুর বাবা ও মা আমাদের কিছুতেই বার হতে দিতে রাজি হলেন না। কারণ, রাস্তার মোড়েই মিলিটারি পাহারা দিচ্ছে। তারা ছায়া দেখলেও গুলি করে। উপায় নাই। রাতে আমাদের সেখানেই কাটাতে হল। আমরা জায়গামত পৌঁছাতে পারলাম না। যদিও সে রাতে কোনো গোলমাল হয় নাই। প্রায় মাইল দেড়েক পথ অতিক্রম করেছিলাম। যে কোনো সময় গুলি খেয়ে মরতে পারতাম।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৭-৬৮)

এখন একটি চতুর্থ অভিজ্ঞতার কথা উদ্ধার করি। এই অভিজ্ঞতার একটা সম্যক বিশ্লেষণ করিলে প্রচলিত গল্পগাছায় রীতিমতো অনাস্থা আসিয়া উপস্থিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান লিখিয়াছেন: ‘পার্ক সার্কাস এরিয়ায় বিচারপতি সিদ্দিকী, জনাব আবদুর রশিদ, জনাব তোফাজ্জল আলী (ভূতপূর্ব মন্ত্রী), আরও অনেকে ডিফেন্স পার্টির নেতৃত্ব দিতেন। আমরা ছিলাম স্বেচ্ছাসেবক। শিয়ালদহ ও হাওড়া স্টেশনে হিন্দু ও মুসলমানদের ক্যাম্প করা হয়েছিল—যাতে বাইরে থেকে কেউ এসেই হিন্দু বা মুসলমান মহল্লায় না যায়। কারণ মুসলমানরা হিন্দুদের মহল্লায় এবং হিন্দুরা মুসলমান মহল্লায় গেলে আর রক্ষা নাই।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৮)

পরিশেষে শেখ সাহেব শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা পাড়িলেন: ‘এখন অবস্থা হয়েছে আরও খারাপ। বেশ কিছুদিন কোনো গোলমাল নাই। হঠাৎ এক জায়গায় সামান্য গোলমাল আর ছোরা মারামারি শুরু হয়ে গেল। শহীদ সাহেব সমস্ত রাতদিন পরিশ্রম করছেন, শান্তি রক্ষা করবার জন্য। কলকাতায় চৌদ্দ-পনের শত পুলিশ বাহিনীর মধ্যে মাত্র পঞ্চাশ-ষাটজন মুসলমান। অফিসারদের অবস্থাও প্রায় সেই রকম। শহীদ সাহেব লীগ সরকার চালাবেন কি করে? তিনি আরও এক হাজার মুসলমানকে পুলিশ বাহিনীতে ভর্তি করতে চাইলে তদানীন্তন ইংরেজ গভর্ণর আপত্তি তুলেছিলেন। শহীদ সাহেব পদত্যাগের হুমকি দিলে তিনি রাজি হন। পাঞ্জাব থেকে যুদ্ধ ফেরত মিলিটারি লোকদের এনে ভর্তি করলেন। এতে ভীষণ হৈচৈ পড়ে গেল। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার কাগজগুলি হৈচৈ বেশি করল।’ (রহমান ২০১২ [ক]: ৬৮]

দীপেশ চক্রবর্তী মনে হয় এই হৈচৈয়ের মধ্যেই বড় হইয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, হৈচৈটা এখনও—এই ২০২১ ইংরেজি সালেও—থামে নাই। তাই কলিকাতার কাগজে শহীদ সাহেবের নাম আজও  লেখে ‘সুরাবর্দি’—কিম্বা টানিয়া-টুনিয়া ‘সরওয়ার্দি’। তপন রায়চৌধুরীর মতন যশস্বী স্বাধীনতা ব্যবসায়ী বা লিবারেল মনীষীও দেখি এই হৈচৈয়ের গোলে হরিবোল দিতে বাধ্য হইয়াছেন। দেখিয়া মাত্র দুঃখই হয় নাই, শিক্ষাও লাভ হইল।

ইতিহাস মোটেও অতীতের কাহিনি নহে, ইতিহাস অতি বর্তমান পদার্থ—এই সত্যে সংশয় রাখা পাপ বটে। ইহার কাছে মানুষের উপর বিশ্বাস হারানোটা কিছুই নয়, নিছক ছেলেখেলা মাত্র। এই বর্তমানের ইতিহাসটা মহাফেজখানায় খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। পূর্ব বাংলা হইতে পাকিস্তান বিদায় হইয়াছে আজ পঞ্চাশ বছর হইতে চলিয়াছে। তাহাতে কি হইয়াছে? ১৯৪৬ সালের ক্ষতস্থান কি ভরাট হইয়া গিয়াছে? এখনও কি সুরাবর্দির ভূত কলিকাতার অলিগলি ঘুরিতেছে না? হামারি দুঃখের নাহি ওর।

 

এই উদ্ধৃতিকণ্টকিত—না, সত্য বলিতে উদ্ধৃতিসর্বস্ব—লেখাটি শেষ করিতে হইবে আরো একটি কি দুইটি উদ্ধৃতিযোগে। ইহা হইতে কি শিখিলাম আমরা? তপন রায়চৌধুরী বলিয়াছেন, বাঙালি ভদ্রলোক সমাজ লজ্জাও ভুলিয়া গিয়াছেন। আগে লজ্জা কি পদার্থ তাহা তো জানিতে হইবে আমাদের: ‘আমরা, বিশেষত ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা, অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ভিয়েতনামে আর ইরাকে মার্কিনরা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানরা কী করেছে তা আলোচনা করে ধিক্কার দিই, কিন্তু নিজেদের দেশে আমাদেরই আপনজনেরা অন্য ধর্মী স্বজাতীয় মানুষের উপর কী বীভৎস অত্যাচার করেছে, তা নিয়ে হিন্দু বা মুসলমান কাউকেই কখনও নতমস্তকে অপরাধ স্বীকার করতে দেখিনি। ওই পাশবিক কাজগুলির জন্য যেন আমাদের কোনও দায়িত্ব নেই। সাম্রাজ্য-রক্ষার জন্য ইংরেজ যে বীভৎসতার আশ্রয় নিয়েছে তার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থনা দাবি করি। কিন্তু আমাদের করা বিচিত্র কুকর্মের জন্য আমাদের কোনও লজ্জা নেই।’ (রায়চৌধুরী ২০০৭: ১৫৪)

কেন নাই, এই প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ থাকিলে রায়চৌধুরী হয়তো একদিন উত্তরটা পাইয়াই যাইতেন। প্রশ্নটা উত্থাপনের সময় পান নাই তিনি; কেননা, আমরা এখনও সেই ইতিহাসের মধ্যেই বসবাস করিতেছি। প্রমাণের অধিক প্রয়োজন নাই। তবু বলিয়া রাখি, তপন রায়চৌধুরী—যিনি ‘বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোক’ প্রজাতির উপর আস্থা রাখিতে পারেন নাই—তিনি পর্যন্ত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামটি সঠিক বানানে লিখিতে পারেন না—একবার লেখেন ‘সরওয়ার্দি’, আরবার ‘সুরাবর্দি’। ইহাই ইতিহাস—ইহাই অজ্ঞান।

আজ পৌনে একশত বৎসর পার হইতেছে কিন্তু ঘটনাটা মোটেও অতীত হয় নাই। ১৯৫০ সালের দশকে ফরাশিদেশের প্রসিদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁ কহিতেছিলেন, ‘বিগতকে ইতিহাস বলে না। বিগত তখনই ইতিহাস হয় যখন বর্তমান বলিতে পারে বিগতকে ইতিহাসে পাঠাইলাম; বর্তমান মুহূর্তে তাহাকে ইতিহাসে পাঠাইতেছি, কেননা তাহার জীবন বিগত হইয়াছে।’ (লাকাঁ ১৯৯১ [ক]: ১২)

আর একটা সত্য না বলিলেই—বোধ হয়—নয়। ইতিহাস আর স্মৃতিকথা ঠিক এক চিজ নয়। ইতিহাস হইতেছে তাহাই যাহা ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছাশক্তির তাঁবেদার নয়—অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে সত্যের অধীন ব্যক্তিকে হইতে হয় তাহাই ইতিহাস।

তাই ‘হিন্দু-ইতিহাস’ বা ‘মুসলিম-ইতিহাস’ বলিয়া কিছু নাই। অথচ দীপেশ চক্রবর্তী যেমন বলিয়াছেন, ‘হিন্দু-স্মৃতি’ আর ‘মুসলমান-স্মৃতি’ ঠিকই আছে। এই চিজ—যাহাকে ভাগ করা যায়, বিকৃত করা যায়, সাজানো যায়—তাহা হইতে ইতিহাসকে আলাদা জানিতে হইবে। ইতিহাস বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্মৃতিমাত্র নয়; ইতিহাস হইতেছে সেই স্মৃতি—হয়তো বা বলা বেহতর সেই অবিস্মরণীয় পদার্থ—যাহা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাহার পরমের আদেশ আকারে গ্রহণ করে। সিগমুন্ড ফ্রয়েড এই পদার্থেরই অপর নাম রাখিয়াছিলেন ‘অজ্ঞান’। (লাকাঁ ১৯৯১[খ]: ১৮৫)

‘অজ্ঞান’ কি পদার্থ তাহার একটি মামুলি উদাহরণ ১৯৪৬ সালের কলকাতা মহাদাঙ্গার কিশোর প্রত্যক্ষদর্শী, পরবর্তী কালের প্রথিতযশা সম্পাদক, মীজানুর রহমানের প্রবীণ দৃষ্টিতে ধরা পড়িয়াছে। ২০১৩ সালে ঢাকায় বসিয়া তিনি আক্ষেপ করিতেছিলেন: ‘বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে একদা রবীন্দ্রনাথ যে আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় যে আন্দোলন সার্থক হয়েছিল, বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিল, পরম পরিতাপের বিষয় তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৬ বছর পর তাঁর সেই অনুসারীরাই বঙ্গভঙ্গের জন্য মরণপণ করতে দ্বিধা করেনি।’ (রহমান ২০১৩: ১৫)

 

দোহাই

১.আবুল কালাম শামসুদ্দীন, ‘অতীত দিনের স্মৃতি’, আবুল কালাম শামসুদ্দীন রচনাবলী, ২য় খণ্ড, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪), পৃ. ২০৯-৫৪১।

২.আবুল মনসুর আহমদ, ‘আমার-দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর,’ আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০০১), পৃ. ১-৪৯৪।

৩.এএসএম আবদুর রব, শহীদ সোহরাওয়ার্দী (ঢাকা: আদিল ব্রাদার্স এ্যান্ড কোং, ১৯৬৪)।

৪.কামরুদ্দীন আহ্‌মদ, বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ: ২য় খণ্ড (ঢাকা: ইনসাইড লাইব্রেরী, ১৩৮২)।

৫.গোপাল গোস্বামী, ‘১৯৪৬, ১৬ আগস্টের কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’, কলকাতা ও নোয়াখালি দাঙ্গা, অর্জুন গোস্বামী সম্পাদিত (কলকাতা: গাঙচিল, ২০১৬), পৃ. ১৮৪-৮৬।

৬.তপন রায়চৌধুরী, বাঙালনামা (কলিকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ২০০৭)।

৭.দীপেশ চক্রবর্তী, মনোরথের ঠিকানা (কলকাতা: অনুষ্টুপ, ২০১৮)।

৮.মীজানুর রহমান, কৃষ্ণ ষোলোই: কলকাতার মহাদাঙ্গার চাক্ষুষ বিবরণ (ঢাকা: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১৩)।

৯.শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী (ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২ [ক])।

১০.শেখ হাসিনা, ‘ভূমিকা’, শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী; পূর্বোক্ত।

১১. Maulana Abul Kalam Azad, India Wins Freedom, The Complete Version (Hyderabad: Orient Longman, 1988).

১২. Jacques Lacan, The Seminar of Jacques Lacan; Book I: Freud’s Papers on Technique, 1953-1954, ed. Jacques-Alain Miller, trans. John Forrester (New York: WW Norton, 1991[K]).

১৩. Jacques Lacan, The Seminar of Jacques Lacan; Book II: The Ego in Freud’s Theory and in the Technique of Psychoanalysis, 1954-1955, ed. Jacques-Alain Miller, trans. Sylvana Tomaselli (New York: WW Norton, 1991[L]).

১৪. Abul Hashim, In Retrospection (Dhaka: Subarna Publishers, 1974).

১৫. Max Horkheimer and Theodor W. Adorno, Dialectic of Enlightenment: Philosophical Fragments, ed. Gunzelin Schmid Noerr, trans. Edmund Jephcott (Stanford, CA: Stanford University Press, 2002).

১৬. SA Karim, Sheikh Mujib: Triumph and Tragedy, 2nd impression (Dhaka: The University Press Ltd., 2006).

১৭. Parshotam Mehra, ‘Direct Action Day: 16 August 1946’, A Dictionary of Modern Indian History: 1707-1947 (Delhi: Oxford University Press, 1985), pp. 196-97.

১৮. Sheikh Mujibur Rahman, The Unfinished Memoirs, trans. Fakrul Alam (Dhaka: The University Press, 2012 [L]).

১৯. Sheikh Mujibur Rahman, Mémoires Inachevés, trad. France Bhattacharya (Paris: Ginko éditeur, 2017).

২০. Tapan Raychaudhuri, The World in Our Time: A Memoir (New Delhi: HarperCollins, 2011).

২১. Jadunath Sarkar, ‘End of Muslim Rule,’ in J. Sarkar, ed. The History of Bengal; vol. II: Muslim Period, reprint (Dacca: The University of Dacca, 1976), pp. 480-499.

২২. Susobhan Sarkar, ‘Notes on The Bengal Renaissance,’ in S. Sarkar, Bengal Renaissance and other Essays, reprint (New Delhi: People’s Publishing House, 1981), pp. 1-74.

২৩. Taya Zinkin, Reporting India (London: Chatto and Windus, 1962).

 

রচনা: ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১
প্রথম প্রকাশ: দৈনিক জাগরণ, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published.