প্রবন্ধ

মিশেল ফুকোর বাতি জ্বালানি

Spread the love

foucault1.jpg

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

 

~ মিশেল ফুকো বিষয়ে সলিমুল্লাহ খানের সেমিনার ~

মুখবন্ধ

নিচের প্রবন্ধটি বর্তমান লেখকের বলা একটি বক্তৃতার লিখিত ভাষ্য। ফিতার রেকর্ড থেকে অক্ষরে লিখে নেওয়ার মেহনতটুকু করেছেন আমার বন্ধু জামিল আহমদ। তিনি আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। এই বক্তৃতা কয় তারিখে দিয়েছিলাম রেকর্ডে তার নিদর্শন নাই। আমার ধারণা তারিখটা হয়ত মার্চ কি এপ্রিল মাসের কোন শুক্রবার হবে। যতদূর মনে পড়ে এই বক্তৃতামালা শেষ করেছিলাম মোট আট দিনে। বর্তমান লেখাটি দ্বিতীয় দিনের রেকর্ড থেকে তৈরি করা বলে মনে হয়। প্রথম দিনের বক্তৃতা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সঠিক রেকর্ড হয় নাই।

জানিয়ে রাখা যায় আমাদের বিজ্ঞাপিত সমাজের সামান্য নাম ছিল ‘জাক লাঁকা বিদ্যালয়’ আর ঐবারের বিশেষ বক্তৃতামালা প্রচারিত হয়েছিল ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’ নামে। মিশেল ফুকো তাঁর দেশের অপর প্রভাবশালী তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁর ঋণ বিশেষ স্বীকার করেন নাই। তবে লাকাঁর ঋণ তিনি দুই হাতেই নিয়েছেন।

তত্ত্বজ্ঞানী জাক দেরিদার সঙ্গে ফুকোর মতভেদ প্রকৃত প্রস্তাবে মহাত্মা লাঁকার শিক্ষার দুই দিক নিয়ে টানাটানির অধিক নয়। জাক লাকাঁ ভাষার বা পদের একাধিপত্য বলে যে উপপাদ্য প্রচার করেন, দেরিদা সেই বক্তব্যই নিজের বলে জাহির করেছিলেন। ‘লেখার বাহিরে কিছু নাহিরে’ বলে তিনি বেশ বাড়াবাড়ি করেছিলেন বৈ কি ।

মিশেল ফুকো আঁকড়ে ধরেন জাক লাকাঁর অপর একটি উপপাদ্য। এই উপপাদ্য অনুসারে মানুষের ইতিহাসে ভাষাই শেষ কথা নয়, শেষ কথা ‘সহজ মানুষ’ বা সাবজেক্ট। যে ইতিহাসে অর্থ তৈরি করে থাকে তাকেই সহজ মানুষ বলে। জীবনের শেষদিকে ফুকো প্রকারান্তরে সেই সত্য স্বীকার করেছিলেন। বাতি জ্বালানি বা এনলাইটেনমেন্ট বিষয়ে মহাত্মা ফুকোর বক্তব্যে সেই অঙ্গীকারের পুবাল হাওয়ার ছোঁওয়া পাওয়া যায়।

সকলেই জানেন মনীষী মিশেল ফুকো ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮৪ (অর্থাৎ তাঁহার অকাল মৃত্যুর পূর্ব) পর্যন্ত ফরাসি দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় কলেজ দহ ফঁসের অধ্যাপক ছিলেন। অনেকেই জানেন তিনি ঐ বিদ্যালয়ে যে অধ্যাপনার পদ অলংকৃত করতেন তার নাম ছিল ‘চিন্তাজগতের ইতিহাস’। ইতিহাস বিচারে প্রতিষ্ঠালব্ধ ফরাসি মনীষী ফেরনঁ ব্রদেল (Fernand Braudel) প্রস্তাবিত পদ্ধতির বিরুদ্ধাচরণ করেন তিনি। ব্রদেল যেখানে এক যুগের সহিত অন্য যুগের যোগধর্ম বা ‘কনটনুয়িটি’ আবিষ্কার করার দিকে মন সংযোগ করতেন সেখানে ফুকো যুগান্তর বা এক যুগের সহিত অন্য যুগের বিয়োগধর্ম অথবা ‘ডিস্কনটনুয়িটি’র জয় ঘোষণা করতে বিস্তর দিনক্ষণ ব্যয় করেছিলেন। (দান্তো ১৯৯৮: ১৮১-৮২)

এই দিক থেকে দেখলে ‘মানুষের অবসান’ বিষয়ে ফুকো প্রচারিত বিতর্কে বিয়োগধর্মই বড় মনে হয়েছিল। অথচ এনলাইটেনমেন্ট ওরফে ‘বাতিজ্বালানি’ বিষয়ে তাঁর কহতব্য কী হিসাব করলে বিপরীত সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য ঠেকে। হিয়ুম্যানিজমে নাস্তিক্যজনিত অনিকেত ফুকো শেষ পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টে আস্তিকতা অর্জন করেছিলেন।
(৯ নবেম্বর ২০০৭)

মূল বক্তৃতা

ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশন এই নামে একটা বই ইংরেজিতে বেরিয়েছে। এটা তাঁর লেখার কালেকশন। বইটা এখনও আমার হাতে আসে নাই। আপনারা অবশ্যই জানেন ঢাকায় গবেষণা করতে বড় অসুবিধা – সাহিত্যের, বইপত্রের অভাব। আপনি যদি এয়ুরোপীয় বিদ্যা নিয়ে আলোচনা করতে চান, আপনার এয়ুরোপীয় ভাষা জানতে হবে। আর ভাষা জানলেও চলবে না, এয়ুরোপীয় মালটা, মেটারিয়েলটা তো বাজারে বা লাইব্রেরিতে পেতে হবে। আমাদের এখানে এমন কোনো লাইব্রেরি নাই, যেখানে আপনি গোছানোভাবে এয়ুরোপীয় সাহিত্য পাবেন। তো আমরা নির্ভর করি সাধারণ ব্যক্তিগত যোগযোগের উপর।

এখন ‘ফুকো’র এই লেখাগুলো সম্পর্কে একটা বাড়তি কথা আছে।

ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে উনি কিছুদিন উৎসাহ বোধ করেছিলেন। অবশ্য পরে সেই উৎসাহের আগুনে কিছু বালিও ঢেলে দেয়া হয়। ঢেলে দেন তিনি নিজেই। সেইজন্য আমরা এ বিষয়ে তাঁর লেখা সব আর সহজে পাই না। এগুলো ঠিক তাঁর বন্ধুরাও আর ছাপতে চান না। ঘটনাচক্রে এই লেখাগুলোর একটা ইংরেজি সংকলন বেরিয়েছে ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশন নামে। আগেই বলেছি, সেটা আমি জোগাড় করতে পারি নাই। সৌভাগ্যের মধ্যে ফরাসিতে যে কয়টা লেখা বের হয়েছে সেগুলো আবার আলাদাভাবেও অনুবাদ হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়, আমি পড়েছি ওই কয়টাই ।

এসব লেখা ফুকোর তিনটা ইংরেজি বইয়ে পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর পরে এসেনশিয়াল রাইটিংস্ অব মিশেল ফুকো নামে প্রকাশিত হয়েছে এগুলো। এক ভলিয়ুমের নাম এথিক্স। দ্বিতীয়টার নাম এস্থেটিকস্। তিন নম্বরের নাম পাওয়ার। আমার হাতের এই বই [ফটোকপি দেখিয়ে] আমি কিছু কিছু এইসব থেকে তৈরি করেছি।

আমাদের এই সেমিনারের বিষয় মিশেল ফুকো। আমরা বাংলায় বলছি ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’। ইংরেজিতে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিশেল ফুকো’। তো এখন প্রশ্ন হবে, সবাই বলবে – ‘মিশেল ফুকো’তে আমাদের আগ্রহ কেন? উত্তর হতেই পারে যে মিশেল ফুকো সম্পর্কে যে কোনো লোক যখন আগ্রহী আমরা তখন আগ্রহী হবো না কেন? কিন্তু আমি বিশেষ বলছি ফুকো কখন বিখ্যাত হন।

ফুকোর বিখ্যাত থিসিসের কথা ছেড়ে বললে বলা যায়, তাঁর প্রথম বিখ্যাত বই ১৯৬৬ সনে প্রকাশ পায়। সেই বইয়ের নাম ইংরেজিতে দি অর্ডার অব থিংস। এইটা অনুবাদ। ১৯৭০ সনে হয়েছে। মূল নাম ছিলো ‘লে মো এ লে শোজ’ (Les mots et les choses) মানে ‘ওয়ার্ডস এন্ড থিংস’। এই বইয়েরই ইংরেজি নাম হয়েছে ‘দি অর্ডার অব থিংস’।

সাবটাইটেলটা লক্ষ্য করবেন: ‘এন আর্কিওলজি অব দি হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’। ফ্রান্সে যেটাকে ‘হিয়ুম্যান সাইন্সেস’ বলে ইংরেজিতে তাকেই আমরা ‘হিয়ুম্যানিটিজ’ আকারে চিনি। সেখান থেকে তিন চারগুচ্ছ বেছে নিয়েছেন ফুকো। তাদের জন্মবৃত্তান্ত – মানে ইতিহাসই বলা যায় – আলোচনা করেছেন। তার মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন। যেটাকে আমরা পশ্চিমে হিয়ুম্যানিজম বলি সেটা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করার মত। আমি ফুকোর থিসিসটা সংক্ষেপে আপনাদের বলছি। এতদিন যেমন আমরা মনে করতাম, হিয়ুম্যানিজম ও এনলাইটেনমেন্ট একই জিনিস। এই দুইটা বড় বড় শব্দ পশ্চিমা দর্শনে আছে, এই দুইটাকে আমরা প্রায় একই মনে করতাম। অথচ এই দুই জিনিস এক জিনিস নয়। দুইটাকে আলাদা করতে হবে।

১৯৬৬ সনে ফুকো বলেছিলেন ‘আমি হিয়ুম্যানিজম জিনিসটা পছন্দ করি না’। কারণ ‘হিয়ুম্যান’ কথাটাই অসার ও অর্বাচীন। হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক হিসেবেই তিনি এই বইটা লেখেন। যদিও দেখবেন নাম আছে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’, তথাপি খেয়াল রাখবেন ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ যে অর্থে বলা হয় সেই অর্থে হিয়ুম্যানিজম বলাও চলে। যেমন ধরেন আগে স্কুল কলেজে যে বিষয়বস্তু পড়ানো হতো, যেমন গ্রামার বা বলা যাক আরবিতে যাকে বলে তফসির বা ইন্টারপ্রিটেশন, সেই ধরনের জিনিসকে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ এয়ুরোপখণ্ডে বলা হতো। এয়ুরোপে ওগুলোর নাম ছিল ‘হিয়ুম্যানিস্ট স্টাডিজ’। আমরা যে এখনো হিয়ুম্যানিটিজ গ্রুপ (মানবিক বিদ্যা) আর সায়েন্স গ্রুপ (বা বিজ্ঞান বিদ্যা) যোগে ম্যাট্রিক বা এসেসসি পাস করি ওইটা ওই জায়গা থেকেই এসেছে।

‘হিয়ুম্যানিজম’ কথাটা আস্তে আস্তে অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। একটা উদাহরণ দেখাতে পারি। যেমন আপনি গ্রামার পড়েন। কেন পড়েন? কারণ আপনি ভাষা বুঝতে চান। তা ভাষা পড়েন কেন? কারণ মানুষ ভাষায় কথা বলে। তাহলে, দি স্টাডি অব গ্রামার এন্ড দি স্টাডি অব ল্যাঙ্গুয়েজ ক্যান বি আল্টিমেটলি রেফারড টু ইয়োর ইন্টারেস্ট ইন হিয়ুম্যান বিয়িংস অর দি হিয়ুম্যানিটি এ্যাজ এ হোল। এই হচ্ছে বিষয়। শেষ বিচারে আপনি মানবে আস্থা রাখেন। আপনি মানবজাতিতে আগ্রহী, মানবজাতি কথা বলে সুতরাং কথা বলাটাই মানবজাতির চরিত্র। এই অর্থে আপনিও হিয়ুম্যানিস্ট। এখন আমরা বলি কি আপনি যদি ইতিহাস পড়েন, তো আপনি হিয়ুম্যানিটিজই পড়ছেন। নানাভাবে আমরা শব্দগুলির আকৃতি পরিবর্তন করে দিচ্ছি। হিয়ুম্যানিটি কথাটা লক্ষ্য করেন, এইটা থেকে হিয়ুম্যানিটিজম না হইয়া হইল ‘হিয়ুম্যানিজম’। একসময় একরকম বলা হতো, আস্তে আস্তে এর বদল ঘটলো। শব্দের ইতিহাস ট্রেস করলে, তার পায়ের চিহ্ন ধরে আগাইলে আপনি এটা বুঝতে পারবেন।

খুব সংক্ষেপে বলছি। ফুকো এপিয়ারড ইন ১৯৬৬ এ্যাজ এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। লক্ষ্য করেন। এখন হিয়ুম্যানিজম মানেটা কী? আমি সেজন্য বলছি, তখন ফ্রান্সে যে বস্তুকে ‘সিয়ঁস উমেন’ বা ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ বলা হতো সেটাই আমাদের বিদ্যার মানবিক শাখা। ওরা ফ্রেঞ্চে হিয়ুম্যান উচ্চারণ করে উমেন (humaine) আকারে।

এই যে উমেনের সমালোচনা ফুকো করলেন তার সুদ বাবদ ওঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আনুমানিক বারো বছর পর ১৯৭৮ সন নাগাদ উনি ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু?’ নামধারী প্রবন্ধটা লেখেন। এটা সেই ১৯৭৮ সালের প্রবন্ধ। আমি দেখাতে চাচ্ছি বারো বছরের মধ্যে কী পরিবর্তনটা হলো। পরিবর্তনটা হয়ে গেল। ফুকো বলছেন যে, ‘১৯৬৬ সনে কী যেন বলেছিলাম আমি, তার দ্বারা আমি চিরকাল বন্দি থাকবো কেন? আমি তো বন্দি থাকতে বাধ্য নই। আই হ্যাভ এ রাইট টু চেঞ্জ মাই ওপিনিয়ন। প্রত্যেকে নিজের মতামত বদলাতে পারে।’

কিন্তু আমাদের আগ্রহ হলো উনি কী, কোন যুুক্তি দেখিয়ে নিজের মতামত বদলালেন? অথবা তিনি যেটা বলছেন সেটা দিয়ে আমাদের প্রতারিত করছেন না তো? সত্যি বদলেছেন কি নিজের মতবাদ? তখন আরেকটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন আসে, হোয়াট ইজ (হু ইজ নয়) দি রিয়েল মসিয়ঁ ফুকো? আসল ফুকো কোনটা? আমরা দেখব এটাও পরে অনেক লোকের মাথাব্যথার কারণ হবে।

আমি আবার বলি। ১৯৬৬ সনে ফুকো বলছেন, ‘আমি হিয়ুম্যানিস্ট নই, আই অ্যাম এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম এ্যাজ এন এপ্রোচ।’ আবার পরে বলছেন কি, ‘আই স্টিল রিমেন এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। বাট নাউ লেট মি টেক আউট এনলাইটেনমেন্ট ফ্রম দ্যাট ডুয়ো – আওয়ার কাপল্। আগে হিয়ুম্যানিজম বলতে এনলাইটেনমেন্টকেও বোঝানো হতো। কমসে কম ফ্রান্সে বোঝান হতো। সেই জন্যই উনি বলছেন, আমার ক্রিটিসিজম ইজ স্টিল ভ্যালিড ইন সো ফার এজ হিয়ুম্যানিজম ইস কনসার্নড. … ..বাট আই অ্যাম নাউ এ ফলোয়ার অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রেডিশন।’ কিন্তু আমরা ১৯৬৬ সনে মনে করেছিলাম, হি ইজ এ ক্রিটিক অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রাডিশন টূও, হি ইজ এগেইন্স্ট দি এনলাইটেনমেন্ট।

আর ১৯৭৮ এর পর থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত (ওঁর মৃত্যু হয়েছে ১৯৮৪ সনে) এই সাত বছর উনি অনবরত একটি ভিন্ন মতবাদ প্রচার করেছেন: হোয়াট উই নিড টুডে ইজ এ নিউ এনলাইনটেনমেন্ট। এয়ুরোপের আজকে দরকার নয়া বাতি। অ্যামেরিকার আজকে দরকার নয়া বাতি। আজ সারা পৃথিবীর দরকার নয়া বাতি।

তাহলে ইনি নয়া ‘বাতি-জ্বালানি’ বা এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) বলতে কী বোঝাচ্ছেন? আগের লোকেরা এনলাইটেনমেন্ট বলতে কী বোঝাত? তারপর তিনি পরিষ্কার উচ্চারণ করেছেন, আমি যাঁদের উত্তরাধিকারী তাঁদের মধ্যে – আমার পূর্বসূরীদের মধ্যে – ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল বটেন। এইটা মনে রাখা দরকার। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে তাঁর সমসাময়িক দার্শনিক কে? হাবারমাস (Habermas)। মিশেল ফুকোর জন্ম ১৯২৬ সনে। হাবারমাসের ১৯২৯ সনে। মানে ফুকোর চেয়ে তিনি তিন বছরের ছোট। হাবারমাসের একটা বই আছে ‘দ্যা ফিলোসফিকাল ডিসকোর্স অব মডার্নিটি। ওতে একলা ফুকোর উপর আছে দুইটা অধ্যায় আর অন্যান্য দার্শনিকদের উপদেশ মিলিয়ে মোট বারোটা অধ্যায়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বই। তাতে আপনি দেখতে পাবেন মিশেল ফুকো এবং হাবারমাসের মধ্যে কিছু মিল আছে আবার কিছু অমিলও আছে। আমার বক্তব্যের সারকথা এটাই।

মিশেল ফুকো যিনি ১৯৬৬ সনে হিয়ুম্যানিজমের সমালোচকরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি ১৯৭৮ সন নাগাদ নিজের মতবাদ খানিকটা বদলিয়ে নিলেন। আমরা এখন অনুসন্ধান করবো, আদৌ তিনি বদলিয়েছেন কিনা। এই আমার প্রস্তাব, এই আমার প্রতিপাদ্য। আমাদের শুদ্ধ দেখতে হবে ফুকোর উপপাদ্যটা কী? উনি কী প্রমাণ করতে চান? হিয়ুম্যানিজমকে উনি যদি বর্জনই করেন তো হিয়ুম্যানিজমের ত্রুটিটা কী? আর উনি যদি নতুন করে এনলাইটেনমেন্টেরই ভক্ত হলেন তবে এনলাইটেনমেন্টের কোন গুণটা আছে যে ফুকো কারণে-অকারণে হিয়ুম্যানিজম-এনলাইটেনমেন্টর বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটিয়ে একলা এনলাইটেনমেন্ট তত্ত্বের আঁচলটি আকঁড়ে ধরেন?


এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমে লক্ষ্য করবেন যাদের মধ্যে প্রথমে মিলন হয়েছিল, ফুকো প্রথমদিকে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখতে পেলেন। এখন আপনাদের মধ্যে কেউ যদি আবার দুইয়ের মধ্যে নতুন মিলন ঘটাতে পারেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার।

তাহলে আমাদের আলাদাভাবে বলতে হবে হিয়ুম্যানিজম কী জিনিশ, আর এনলাইটেনমেন্টইবা কী বস্তু? তারপর আরেকটা কথা আছে। সেটাও এটার সাথে যুক্ত। আপনারা না বললেও আমি জানি, সেটার নাম ‘মডার্নিটি’, এদের সাথেই যুক্ত। আপনি তিন নম্বর হিসেবে বলতে পারেন। হিয়ুম্যানিজম, এনলাইটেনমেন্ট, মডার্নিটি। এই সব কথা এখনও এয়ুরোপে আলোচিত হয়।

এখন এয়ুরোপের নতুন দর্শনের যে অধ্যায়কে আমরা নাম দিচ্ছি ‘পোস্টমডার্নিজম’, তার প্রবক্তারা বলছেন ‘মডার্নিটি জিনিসটা একসময় জন্ম নিয়েছিল। এখন তার মৃত্যু হয়েছে।’ তারপরে আমরা আরেকটা মতবাদের জন্ম দিচ্ছি। এখন লক্ষ্য করেন এখানে একটা প্রভাবশালী শব্দ আছে ‘টাইম’। মডার্নিটি ইজ এ কনসেপ্ট রিলেটিব টু টাইম। ইট হ্যাজ বিন বর্ন অ্যান্ড ইট লিভড ফর এ হোয়াইল, সো ইট উইল ডাই সামটাইম অন। অর্থাৎ তাকে একটা অর্গানিজমের মত দেখতেছি। মডার্নিটি ইজ লাইক এ বডি, যার জন্ম আছে, বিকাশ আছে এবং মৃত্যু আছে।

কিন্তু মডার্নিটির আরেকটা ধারণাও আছে। এটার প্রবক্তা ‘বোদলেয়ার’। শার্ল বোদলেয়ার। ফরাসি কবি, যাঁর কবিতা আমরা অনেকেই ‘বুদ্ধদেব বসু’র বাংলা অনুবাদে পড়েছি। উনি বড় একজন চিত্র সমালোচকও ছিলেন। তাঁর অনেক চিত্র সমালোচনামূলক লেখা আছে। তার মধ্যে আমি দুইটা প্রবন্ধের রেফারেন্স রেখেছি এখানে, একটার নাম ‘দি পেইন্টার অব মডার্ন লাইফ’। আরো লেখা আছে। সেটার মধ্যে বোদলেয়ার মডার্নিটির সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘মডার্নিটি ডাজ নট রিলেট টু এনি টাইম, ইট ইজ এন এটিচুড’। অর্থাৎ প্রত্যেক যুগেই কিছু লোক আছে যারা মডার্ন আবার কিছু আনমডার্ন। এটা অনেকটা প্রগতি আর প্রতিক্রিয়ার মত। প্রত্যেক যুগেই কিছু ভালো মানুষ থাকে আবার কিছু মন্দ মানুষ থাকে। অর্থাৎ এমন নয় যে পৃথিবীতে মানুষ একসময় সবাই মন্দ ছিলো আর এখন আমরা সবাই ভালো, এমন নয়। মানে আগে সবাই ভালো ছিল আর এখন সবাই মন্দ হয়ে গেছি এরকম নয়। একটু যুগ ছিলো অন্ধকার যুগ আর এখন আলোকের যুগ, এটা ঠিক নাও হতে পারে। অর্থাৎ আলো অন্ধকার দিবালোক আর রাত্রির মত জড়াজড়ি করে থাকে। এই টাইপের একটি মতবাদ বোদলেয়ার বলেছেন। বোদলেয়ার বলেছেন, ‘আধুনিক জিনিসটা একটা মনোভাবের ব্যাপার, এটা সময়ের ব্যাপার নয়, কাজেই আধুনিকতার মৃত্যু হতে পারে না অথবা আধুনিকতা প্রাচীনকালে ছিলো না এটা বলা যাবে না।’

এই জন্যই বলছি প্রাচীন ভারতের মহাভারত কাব্য যদি আপনি পাঠ করেন, সেটাও আধুনিক মনে হবে। হোমারের কবিতাও আধুনিক মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথা মাঝে মাঝেই বলেছেন। বলেছেন এর মধ্যে একটু ভুলভাল মিশিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন কি, ‘মাঝেমাঝে নদী যেমন বাঁক পরিবর্তন করে সাহিত্যও তাই করে। সেটাই আধুনিকতা।’ কারণ রবীন্দ্রনাথ একটু ইংরেজি পড়ে আন্দাজ করে বলেছিলেন। তাঁর তো ইনজেনুয়িটি আছে, নিজস্ব চিন্তাক্ষমতা আছে। আধুনিকতার সংজ্ঞা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটা প্রবন্ধ আছে। আপনারা দেখতে পারেন। ‘আধুনিক সাহিত্য’ নামে একটা ছোট সংকলন আছে, তাতেও দেখতে পারেন।

তা প্রশ্নটা হলো ‘আধুনিকতা কি স্থায়ী জিনিশ?’ নাকি এটা কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ? এখন যাঁরা পোস্টমডার্নিজম বলছেন, তাহলে তাঁদের এই কথাটার অর্থ কী? একটা হতে পারে যে, আগে মানুষের মনোভাব দুই রকম ছিল। মানুষ ছিল আগে নারী ও পুরুষ । এখন আরেকটা জাতির জন্ম হয়েছে। ধরেন এর নাম হিজড়া। তাহলে দুই লিঙ্গের জায়গায় এখন তিন লিঙ্গ তৈরি করলাম। ভালোমন্দের সাথে মাঝামাঝি আপনি আরেকটা তৈরি করলেন, যারা ভালোও নয়, মন্দও নয়। এরকমই কি আধুনিকতা? নাকি, আধুনিকতা ক্রোনোলজিকাল। এই যে ক্রোনলজি, তা ক্রোনোস বা কালের দেবতার কথা। আমরা বর্ষ ভারতে বলি মা কালি, কালি আমাদের দেবীর নাম। অনেকের ধারণা যে ভদ্রমহিলার চেহারা কালো, তাই তাকে ‘কালি’ বলি আমরা। সেটা পপুলার। সুতরাং বলা যেতেই পারে। কিন্তু এটার মধ্যে আরেকটা কথা আছে, এ কথার অর্থ কালের করাল গ্রাস। কালি মানে ‘গডেস্ অব টাইম’। কাল সবকিছুকে গ্রাস করে। আমরা বলি না ‘তোমারে কালে খাইলো’? মাঝে মাঝে আমরা খারাপ কাল সম্পর্কে বলি আকাল। যথা: ‘আকালের সন্ধানে’।

সমস্যাটা এখানে: আধুনিকতাটা কি ক্রোনোস-এর ভিতরের না বাইরের? বোদলেয়ারের মতটাই আমি সংক্ষেপে বলছি। বোদলেয়ার যেহেতু বলছেন, ‘আধুনিকতা জিনিসটা সময়ের ব্যাপার নয়’ কাজেই আমিও বলবো, ‘পোস্টমডার্নিজম’ কথাটা কোনো অর্থই বহন করে না। ‘সিনস্ দেয়ার ইজ নো মৃত্যু হাউ ক্যান দেয়ার বি পোস্ট মর্টেম?’ যেহেতু মৃত্যু নাই তাহলে আবার মরণোত্তর ময়না তদন্ত হবে কী করে? জীবন্তের কি ময়না তদন্ত হয়? এটা বোদলেয়ারের বক্তব্য। আমি এস্তেমাল করলাম মাত্র।

ফুকো সাহেবও সেই বক্তব্যটাই গ্রহণ করেছেন। গ্রহণ করে ইমানুয়েল কান্টের যুক্তির গাছে ‘গ্রাফ্ট’ করেছেন। গ্রাফ্ট মানে কি? এই যে আম গাছে ‘কলম’ করেন আপনারা। গাছের উপর গাছ লাগিয়েছেন। তাহলে, নতুন একটা বাগান হয়েছে। সেই বাগানের নাম হয়েছে নতুন বাতি-জ্বালানি, নতুন এনলাইটেনমেন্ট। মডার্নিটি ইজ সামথিং ইটার্নাল, ইট হ্যাজ অলওয়েজ বিন। উনি বলছেন এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা এই: এনলাইটেনমেন্ট মানে এতদিন যেমন আমরা যা হিয়ুম্যানিজমের সাথে যুক্ত মনে করতাম সেইটা নয়।

একদা ঈশ্বর ছিলেন, এখন তিনি মারা গেছেন। এখন তাঁর জায়গায় প্রবেশ করেছে মানুষ। এটা এয়ুরোপীয় একজন বড় দার্শনিকের উক্তি। নাম নিৎসে। নিৎসের উক্তিটায় বলা হয়েছে কি না, ‘গড ইজ ডেড’। তার মানে ‘গড ওয়াজ ওয়ানস্ এলাইব’। এট লিস্ট। এই স্বীকৃতিটুকু তো আছে। আসুন এখন আমরা শুকরিয়া আদায় করি তিনি স্বীকার করছেন যে একসময় ঈশ্বর ছিলেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘হু হ্যাজ অকুপাইড দি ডেড গডস্ চেয়ার’? এটিকে ব্যঙ্গ করেছে কার্ল মার্ক্সের শত্রুপক্ষ, আমেরিকান মিডিয়া। যেমন টাইম ম্যাগাজিন ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে একটা হেডলাইন করেছিলো, আমার মনে আছে। আমরা তখন ছাত্র। ওঁরা লিখেছিল, ‘গড ইজ ডেড, মার্ক্স ইজ ডেড এন্ড আই এম নট ফিলিং টুও ওয়েল মাইসেল্ফ’। ফরাসি দেশে আন্দ্রে গ্লুক্সমান বলে একজন দার্শনিক ছিলেন, ইনি কাজ করতেন সার্ত্রের সেক্রেটারি হিসেবে। উনি বলেন যে, ‘পৃথিবীতে এখন আস্তিকতার দিন শেষ হয়ে গেছে, এমনকি কম্যুনিজমের দিনও শেষ হয়ে গেছে, আর আমরা যারা তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করি, সেই আমরাও বোধ হয় মারাই যাচ্ছি। তাহলে সামনের পৃথিবীতে কী আছে আমরা জানি না।’ কী এর নিহিতার্থ? তিনি মিশেল ফুকোর বন্ধু ছিলেন সেই সময়। অনেকটা ফুকোলশিয়ান (Foucaultian) বলা যেতে পারে। আমি ফুকোর উপর এটা আরোপ করবো না।


ফুকো একসময় বলতেন ‘আমি নিৎসের শিষ্য’। পরে দেখা গেলো কি উনি নিৎসের থেকে একটু গা মোচড় দিলেন। শেষ বয়সে উনিই প্রমাণ করলেন যে উনি কান্টেরও শিষ্য।

এখানে একটা কথা বলে রাখার দরকার আছে। আমরা যারা এয়ুরোপীয় দর্শনের ইতিহাস পড়তে চাই তাদের পক্ষে এই নামগুলো প্রথমে কতক ধূম্রজাল তৈরি করে। কান্টের লেখা আমরা সবটুকু পড়ি নাই। কাজেই আন্দাজ করে বলা যাবে না কান্ট কী জিনিস? সেটা ভারতীয় বিখ্যাত হাতির মত। কারো কাছে মনে হবে থামের মত, কারো কাছে কুলার মত, কারো কাছে ঢেঁকির মত। আমরা এখন দেখবো কান্টের কোন অংশটা কী? এইজন্য আমরা শুধু এইটুকু বলবো, এয়ুরোপে যে যুগটাকে এনলাইটেনমেন্ট বলা হয় সেটাকেই আমি খুব সংক্ষেপে বলছি আমাদের যুগ। অষ্টাদশ শতাব্দি বলে যে বড় শতাব্দি ওইটাই এনলাইটেনমেন্টের শতাব্দি। মনে হতে পারে, আমিও মানুষের চোখে একটু ধুলা দিতে পছন্দ করি। কিন্তু আসলে তা নয়। মনে হয় আমরা এখনও কান্টের যুগেই আছি। নচেৎ আমাদের বাতিজ্বালানি শেষ হয় না কেন?

এখন কান্ট সাহেবের প্রবন্ধটাও লেখা হয়েছে একই নামে। কান্ট লিখেছেন হিসেব করে দেখেন সেই ১৭৮৩ বা ১৭৮৪ সময় নাগাদ। এটা অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ পর্যায়। তার মানে আমি এটা বলতে পারি, আমরা বলি কি, ‘দি ওউল অব মিনার্বা বিগিনস্ ইটস্ ফ্লাইট ওনলি আফটার ডার্ক।’ এটা হেগেলের বিখ্যাত উক্তি। মিনার্বা দেবির পেঁচাটি উড়াল শুরু করে সূর্য যখন অস্তাচলে বসে ঠিক তখন। অন্ধকার হয়ে আসছে যখন তখনই পেঁচা রাষ্ট্র হয়। দিনের বেলা পেঁচা বের হতে পারে না।
‘পেঁচা রাষ্ট্র করে দেয় পেলে কোন ছুতা,
জানো না সূর্যের সঙ্গে আমার শত্রুতা?’

কাজেই দিনের বেলা সে বের হতে পারে না। তাই উনি বলছেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন দার্শনিকের পক্ষে তাকে বোঝা হয়ত সম্ভব হয় না। ঘটনা যখন শেষ হয়ে যায়, দার্শনিক তখনই তার সূত্র তৈরি করেন।

কান্টের ক্ষেত্রে সেটা সত্য মনে হচ্ছে। এনলাইটেনমেন্ট প্রায় শেষ পর্যায়ে যখন এসে পৌঁছেছে এয়ুরোপে তখনই কান্ট এই প্রবন্ধটা লিখে বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বলতে আপনারা এতদিন যা মনে করতেন, এনলাইটেনমেন্ট তা নয়।’ ‘ইট ইজ সামথিং ডিফারেন্ট।’

তাহলে এনলাটেনমেন্ট বলতে আসলে এতদিন কী মনে করতেন এয়ুরোপের দার্শনিকরা? দুই একজনের নাম নেন। এনলাইটেনমেন্টের মধ্যে বড় দার্শনিক কারা? যেমন ভলতেয়ার। যাকে কখনো গুরু মানেন আমাদের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী শিবনারায়ণ রায়। তাঁর সম্পাদিত জিজ্ঞাসা পত্রিকা ঢাকায় আসতো বলে আমরা কিছু পড়েছি। উনি এখনো মনে করেন যে আমাদের বাংলাদেশের বা ভারতের মতন তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সমস্যা এনলাইটেনমেন্টের সমস্যা। আমরা এখনো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক দিব্যদৃষ্টি লাভ করি নাই। শিবনারায়ণ রায়ের বক্তব্য অনুসারে এনলাইটেনমেন্টই আমাদের মত গরিব দেশের প্রধান সমস্যা।

তো এনলাইটেনমেন্ট মানেটা কী? আক্ষরিক অর্থে ধরেন আপনি সন্ধ্যাবেলা একটা বাতি জ্বালান। সেটাই এনলাইটেনমেন্ট। যেখানে আগুন নাই, সেখানে আগুন নিয়ে আলো করা। এখন আগুনের দুটা সমস্যা। ইট জেনারেটস বোথ লাইট এন্ড হিট। এখন আপনি যদি এমন একটা আগুন দেখেন হুয়িচ জেনারেটস মোর হিট দ্যান লাইট, তাহলে সেটা অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। আমরা আগুন এনেছি আলো করার জন্যে, কিন্তু অধমদের দেশে ঘটে যায় অগ্নিকাণ্ড। আমরা মনে করি কি এনলাইটেনমেন্ট বলে একটা আদর্শ এয়ুরোপে তৈরি হয়েছে, সেটা আমরা আমদানি করেছি, ইচ্ছায় হোক আর বাধ্য হয়েই হোক। এইটা আমাদের দেশে আগুন জ্বালিয়েছে। আগুন আলোর জন্য না অগ্নিকাণ্ড ঘটানোর জন্য সেটাই বিচার্য বিষয়। শিবনারায়ণ রায় মনে করেন, আগুন জ্বালানোই আমাদের দায়িত্ব, তা অগ্নিকাণ্ড ঘটাবে না আলোক দান করবে সেটা পরের ব্যাপার।

এই ধরনের একটা এটিচুড আছে। এই এটিচুডের একটা উদাহরণ ‘গোলাম মুরশিদ’। তিনি আমাদের এখানে শিব রায়ের ছাত্র। উনি একটা বই লিখেছেন। নাম রিলাকটেন্ট দেবুতাঁত (Reluctant Debutante)। বাংলা মানে লিখেছেন ‘সংকোচের বিহ্বলতা’। এই নামে উনিই বাংলায় অনুবাদ করেছেন, নিজের বই নিজেই। সেখানে বলছেন, মেয়েরা যে প্রথম হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন, আস্তে আস্তে পুরুষেরা মেয়েদের শিক্ষিত করলেন এইটাকে হলো এনলাইটেনমেন্ট। এনলাইটেনমেন্ট সম্পর্কে অনেক আলোচনা আছে। আমি এখানে একটাই বললাম।

আরেকটা হল, এনলাইটেনমেন্টের প্রধান শত্রুর নাম যে জিনিশ তাকে তাঁরা বলেন কুসংস্কার। প্রথমে সংস্কার এবং তার আগে কু লাগিয়ে দিলেন। তাঁরা মনে করেন ঝাড় ফুঁকে বিশ্বাস, পীর ফকিরে বিশ্বাস এগুলোই কুসংস্কার। এটা বলতে বলতে তাঁরা বলেন যে কোনো ধর্মে, মানে নীতিটীতিতে বিশ্বাস করাও কুসংস্কার। এনলাইটেনমেন্টের মূল মেসেজ এইটা।

এনলাইটেনমেন্ট ওয়াজ নোওন ইন এয়ুরোপ এজ এন্টি-রিলিজিয়ন। যেটা থেকে আজকের সেক্যুলারিজম কথাটা তৈরি হয়েছে। শিব রায় বলেন ‘আমরা নাস্তিক।’ এটা বলেন তাঁরা ঘরের মধ্যে। আর পাবলিককে বলেন কি ‘আমরা এনলাইটেন্ড পিপল।’ এখন এইটারই একটা কুৎসিত অনুবাদ করেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মহাশয়: ‘আলোকিত মানুষ’। এনলাইটেনড মানে আলোকিত। আলোকিত শব্দটা খেয়াল করছেন? যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, যেমন আমি এখানে আছি। আর ওখানে বাতি জ্বলছে। আমি আলোকিত হলাম না? আলোটা বাইরে থেকে আসছে। কিন্তু কান্টের লেখা পড়লে আপনি দেখবেন, আমার ভেতর থেকে যদি আলো আসতো, আলো বের হতো তাহলে আমি তো আলোকিত হতাম না, হতাম আলোকদানকারী।

সে হতো ‘আলোকিত’ নয়, ‘আলোকক’। আলোকিত বা আলো মুরগি হবে কেন সে? সে হবে ‘আলোকক’ বা আলো মোরগ। উনি যেটা করছেন সেটা আলো মুরগি বলেই মনে হয়। আসলে এইটা কী? যদি আপনি মার্ক্সের ভাষায় দেখেন, এয়ুরোপের প্রবলেম এমনই। ধনিক শ্রেণী চেয়েছে, আমাদের গরিবরা, আমাদের কথামত চলবে। আমরা তাদের ভালো করে একটু খাওয়াবো পরাবো। তাদের ঠিক যে পরিমাণ বিদ্যা দরকার এ পরিমাণ দেব। যেমন ক্লাস ফাইভ। যেমন এখানে ব্রাক বলে, ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়লেই যথেষ্ট। সেই রকম আর কি ।

এই ধরনের মতবাদই এনলাইটেনমেন্টের মতবাদ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বে আসছে। এয়ুরোপে কী ছিলো সে কথা আমরা মিশেল ফুকোকে বলতে দেব। আমাদের দেশে এর মানে হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, নারী শিক্ষা এবং ঠিক সেইটুকু শিক্ষা যেইটা শুধু দরকার। এইটার নাম হয়েছে ইনফর্মাল এডুকেশন। আর কী বাজে এর বাংলা তর্জমা, ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা’! এইজন্য তাঁরা লাখ লাখ কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছেন। কমনওয়েলথ্ এডুকেশন ফান্ড ইত্যাদি আবরণে হেন কাজ নাই তারা করছেন না। লোকগুলোকে ‘শিক্ষিত’ করতে হবে। শিক্ষার আলো বিলাতে হবে।

শিক্ষার সংজ্ঞা কী? সংজ্ঞাটা স্বচ্ছ বটে: যেটুকু করলে সে করে খেতে পারবে, পরতে পারবে। কান্ট সাহেবের সংজ্ঞাটা ঠিক সেইরকম নয়। আমি এই জন্যই বলছি, যখনই আমরা কোনো শব্দ পাব, শব্দটার গিভেন যে অর্থ বাজারে সেটাই আমাদের মাথায় প্রথমে লাফ দিয়ে আসবে। কিন্তু দেখবেন যে ওইটার বিরুদ্ধে লড়াই একটা করতে হবে আপনাকে। নইলে আপনি একজনের রক্ত আরেক জনের গায়ে দেবেন। উদোর পিণ্ডি দেবেন বুদোর ঘাড়ে ।

আমি প্রথমেই বলেছিলাম জানতে হবে পরিবর্তনটা কেন? তথাকথিত হিয়ুম্যানিজম বা মানবতাবাদের সমালোচক হিসেবে জন্মগ্রহণ করার পর মিশেল ফুকো হঠাৎ করে এনলাইটেনমেন্টের ভক্ত হয়ে উঠলেন কেন?

তাঁকে তো কিছু একটা করতে হবে। উনি বললেন, এনলাইনটেনমেন্ট কথাটাকেও আমি খৎনা বা ক্যাসট্রেট করাবো। দ্যা ওয়ার্ড ইটসেলফ্ হ্যাজ টু বি ক্যাসট্রেটেড। এর মধ্যে দুইটা অর্থ মিশে আছে। এনলাইটেনমেন্ট অর্থে এতদিন বলা হতো, আলোকিত করা। উনি বললেন, না তা নয়। বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট অর্থ আলোকক তৈরি করা। যে লোক আলোর দ্বারা আলোকিত হয় না, যে নিজেই আলো দেয়, এমন লোককেই প্রকৃত প্রস্তাবে বলা হবে এনলাইটেনড ম্যান। উনি রেফারেন্স দিলেন কান্ট সাহেবের। কান্ট ভরসা ফুকো। খেলা জমলো।

এখানেই ফুকোর মূল বক্তব্য। এনলাইটেনমেন্ট মানে আগে বলা হতো হিয়ুম্যানিজম। হিয়ুম্যানিজমের ভেতর কী আছে। হিয়ুম্যানিজমের ভিতর আছে একটা গোঁয়ার গোবিন্দ, একটা এরোগেন্স। এরোগেন্সটা কী? ম্যান হ্যাজ রিপ্লেস্ড গড এজ দি সেন্টার অব হিয়ুম্যান অ্যাটেনশন। এইটাই বটে হিয়ুম্যানিজম। এটা আসছে কোথা থেকে ? কোপারনিকাস আর কেপলার থেকে। সৌরজগতের কেন্দ্র আর পৃথিবী নয়, সূর্য। এইটাও একটা মতবাদ। কেন্দ্র কী? এই কথাটার মধ্যেই মতান্ধতার নিশানা হাজিরনাজির আছে।

তারপর একদিন বোঝা গেল কিনা মানুষ ‘আশরাফুল মখলুকাত’ এই কথাটাও ঠিক নয়। মানুষ আর পাঁচটা প্রাণীর মতই আরেকটি প্রাণী বটে। এটা ডারুয়িন বললেন।

তারপর সবশেষে জানা গেল, মানুষ যুক্তিশীল এটাও ঠিক নয়। মানুষের মধ্যে যুক্তি ও অযুক্তির সমান প্রাধান্য এবং মানুষ যে অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতার সঙ্গে বলেছে আমরা যুক্তিশীল, আসলে মানুষের ইতিহাস দেখলে তা সত্য মনে হয় না। এই দুনিয়ায় যত যুদ্ধবিগ্রহ এবং যত অন্যায় অবিচার সেইগুলিও যদি মানুষই করে থাকে তবে মানুষ একাধারে যুক্তিশীল এবং অন্যাধারে যুক্তিহীন দুটো কথাই সত্য এ কথা একসাথেই বলতে হয়। ফ্রয়েডের আবিষ্কার এ ছাড়া আর কী?

foucault001.jpg
মিশেল ফুকো

তবে হ্যাঁ, মানুষ কথা বলে । এই অর্থে যদি আপনি বলতে চান মানুষ যুক্তিশীল তবে ঠিক আছে। জাক লাকাঁ দেখাচ্ছেন এ সত্যে আত্মম্ভরিতার কিছু থাকছে না। কারণ মানুষ যতটা না ভাষার মনিব, তার চেয়ে ঢের বেশি তার গোলাম। মানে দাস। দাশ নয়; দাস।

তিনটা অংকুর আছে হিয়ুম্যানিজমের। একটা: ম্যান এজ দি সেন্টার বা কেন্দ্রাভিমানী মনু বা মনিশ্বর। লক্ষ্য করেন, এই আইডিয়াটা। মানুষ ঈশ্বরের জায়গা দখল করেছে। এই এরোগেন্সেরই নাম ছিলো হিয়ুম্যানিজম। কথাটার বাংলা দাঁড়ায় মনিশ্বরবাদ। এটা আমি বানালাম। আর ওই এরোগেন্স প্রচারক বা পয়গম্বর আন্দোলনের নাম এনলাইটেনমেন্ট। ইহার বাংলা হতে পারে বাতিশ্বরবাদ। তাতে বোঝায় কী? বোঝায় মানুষ নিরন্তর প্রগতিসাধন করছে। প্রগ্রেসকে আমরা বাংলায় বলেছি প্রগতি। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রগতি হয়েছে। আগে মানুষ বনেজঙ্গলে ছিল, তারপর মানুষ গ্রাম করেছে, এরপর শহর করেছে। এখন শহর থেকে মানুষ চাঁদে যাবে। ধরেন এইটাই প্রগতির ইতিহাস।

মানুষ জঙ্গলে ছিল। সেখানে মানুষ কী করতো? মানুষ সেখানে ছিল পেগান। তারা প্রকৃতি-পূজারি ছিল। তারপর একসময় তারা বুঝতে পেরেছে প্রকৃতিপূজা নয় কোন দেবির কি দেবতার পূজা করতে হবে। তারপর মানুষ ভাবল, না, না, গোষ্ঠী বা জাতি (ট্রাইব) পূজা এসবও ঠিক নয়। সমগ্র নিখিল জগতের এক প্রতিপালক আছেন তাঁর পূজা করতে হবে। এখন নয়া এনলাইটেনমেন্ট বলছে, আসলে নিখিল জগতের একমেবাদ্বিতীয়ম যে প্রতিপালক আছেন সে সত্যও মিথ্যার রকমফের বৈ নয়। এই প্রগতির ধারণা এইভাবে দেখা যাচ্ছে। তাহলে এই ধারণাগুলির ধারাকেই আমরা বলছি এনলাইটেনমেন্ট।

মানুষ এখন বুঝতে পারছে এই বিরূপ বিশ্বে সে নিয়ত একা। তার কোন প্রভু নাই। যে পরিমাণে সে নিজেই নিজের প্রভু সেই পরিমাণেই সে অসহায়। ফ্রিডম ইজ এ ডেঞ্জারাস থিং। ম্যান হ্যাজ টু নো হি ইজ ফ্রি এন্ড হি ইজ এলোন ইন দ্যা ইউনিভার্স। এই যে মনোভাব, এটাই এনলাটেনমেন্টের বক্তব্য হিসেবে জারি আছে।

তার সাথে যুক্ত হলো এটা ও সেটা। জোর ও জবরদস্তি। ধর্ষকাম ও বলপ্রয়োগ ছাড়া এনলাইটেনমেন্ট হয় না। আমি বললাম অসুবিধা কী, তুমি তোমার মনোভাব নিয়ে তোমার বাড়িতে থাক আর আমি আমার মনোভাব নিয়ে আমার বাড়িতে থাকি। কিন্তু তা তো নয়। বাতিওয়ালা বলে বসে: তোমাকে আমার মতবাদ গ্রহণ করতে হবে। নইলে আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব।

এই যুদ্ধ নিয়ে এয়ুরোপ গেল আমেরিকায়। সে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের বললো, তোমরা তোমাদের এই প্রাগৈতিহাসিক ধারণা নিয়ে থাকতে পারবে না। তোমাদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে হবে। শুধু গ্রহণ করলেই যথেষ্ট হবে না। তোমাদের বৈজ্ঞানিক ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। সেক্যুলারিজম গ্রহণ করতে হবে এবং মাঝে মাঝে খ্রিস্টধর্ম এবং সেক্যুলারিজম এক হয়ে গেছে। এটার লম্বা ইতিহাস। তাঁরা একহাতে বাইবেল আরেক হাতে রাইফেল নিয়ে গেছে। জয় করেছে। জয় করে তাঁরা সেখানে সভ্যতা কায়েম করেছে। এটার নাম এনলাইটেনমেন্ট।

এনলাইটেনমেন্ট একটা দার্শনিক মতবাদ মাত্র নয়। এটা একটা রাজনৈতিক আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরে, সবশেষে বলা হচ্ছে কি এনলাইটেনমেন্টের ফলে আমরা যারা আমেরিকান-ইন্ডিয়ানদের মত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাই নাই – চীন, আরব বা আফ্রিকা এই সমস্ত দেশের মানুষ – যারা এয়ুরোপের সংস্পর্শে এসেছে তারাও এয়ুরোপের মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। এখন আমরা আমাদের দেশে এমন সব মানুষ তৈরি করেছি যারা এয়ুরোপীয় মতবাদকে আমাদের ভাষায় প্রচার করেন এবং সেই প্রচার বাবদ তারা যেই যুক্তি দেন সেইটাই এনলাইটেনমেন্টের যুক্তি। মানুষকে আলোকিত হতে হলে এই কুসংস্কার সেই কুসংস্কার বাদ দিতে হবে। ইনফ্যাক্ট সমস্ত সংস্কার বাদ দিতে হবে।

এখন আমাদের সমালোচনা হবে: কুসংস্কার বাদ দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সমস্ত সংস্কার বাদ দেওয়া কি সম্ভব? নাকি এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটা সংস্কার নয়? মিশেল ফুকো এই কথা জিজ্ঞেস করেছেন। উনি বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটি সংস্কার। তাহলে সেটা কী সংস্কার? সেটার আগে কি ‘ক’ু কথাটা ব্যবহার করা যায়? ধরুন, এনলাইটেনমেন্টও আরেকটি কুসংস্কার। এক কুসংস্কারের বদলে তবে আপনি আরেক কুসংস্কার আনছেন। তাই না? তার বিরুদ্ধে লড়াই করার দাওয়াটা কী আপনার? এই হচ্ছে জিজ্ঞাসা।

এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটা ভালো কেন? উনি বললেন, এনলাইটেনমেন্ট এমন একটা মতবাদ যে নিজের খাওয়াইর ভিতরই নিজের দাওয়াই তৈরি করে নেয়। ওর বিষের মধ্যেই ওষুধ আছে। এনলাইটেনমেন্ট ইজ এ ডকট্রিন অব প্রগ্রেস অব ম্যানকাইন্ড। সামন্তবাদের পরে পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদের পরে সমাজতন্ত্র। এটাকে বলে গ্রান্ড ন্যারেটিভ অব প্রগ্রেস। অথবা কুসংস্কার থেকে সুসংস্কার।

কিন্তু তার ত্রুটিটাও এইখানে। এটা খোদ কার্ল মার্ক্সই বলেছেন। আজ পর্যন্ত যত ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে সব ধর্মই বলেছে কি না আমি সত্য, আমার আগের সব ধর্মই মিথ্যা, সব ভুল। আমিই হইলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সঠিক ধর্ম। খ্রিস্টধর্মের মূল আর্গুমেন্টটা কী? আর্গুমেন্টটা এইমতো: আমরা এয়াহুদি জাতির সন্তান, কিন্তু বর্তমান এয়াহুদি যারা রাব্বাই আছেন, তারা ধর্মটাকে বিকৃত করেছেন। কাজেই ধর্মটাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য আরেকজন নতুন নেতা এসে গেছেন। তিনি ‘হযরত ঈসা’। আমরা তাঁর অনুসারী। তিনি ভগবানের বা ভগওয়ালার পুত্র। সুতরাং আমাদেরটাই সঠিক ধর্ম। ইতোপূর্বে আগের ধর্ম যেহেতু বিকৃত হয়েছে তাই সেটা বাতিল। এটাই সর্বশেষ ধর্ম।

একই যুক্তিতে ইসলামের শর্তও এই: ইসলামই সর্বশেষ ধর্ম। ইসলাম এমবডিস দ্যা লেটেস্ট ট্রুথ, সর্বশেষ সত্য। আমার শেষ বহির ধর্ম, লাস্ট রিভিলড রিলিজিয়ন। আর কোন রিভিলড রিলিজিয়ন আসবে না। অর্থাৎ এই পর্যন্ত যেগুলো এসেছিল সব বাতিল। এখন ইসলামের পরে কে আসবে? ইসালামের পরে শুধু ইসলামই আসতে পারে। আর কিছু আসতে পারে না। হোয়াটয়েভার কামস মাস্ট বিন উয়িদিন ইসলাম। যদি এটা ইসলাম-বিরোধী হয় তাহলে এটা বাতিল অথবা ইসলামের ভিতরের হয় তাহলে এটা এর অংশ। আবার আরেকটা ইসলামের দরকার নাই। দি সেইম ইসলাম দেয়ারফোর কেন নট বি ইমপ্রুভড।

এখন মজার বিষয়, ধনতন্ত্রের ইতিহাসও একই যুক্তিতে এগিয়েছে। এটা কার্ল মার্ক্স বলছেন। উনি বলছেন যে একসময় পৃথিবীতে মানুষ বনেজঙ্গলে থাকতো, সেখান থেকে কিছু মানুষ কিছু মানুষকে দাস করেছে দাস প্রথা তৈরি করেছে। তারপর মানুষ সামন্ত—প্রথা – তৈরি করেছে। কিছু মানুষ কিছু মানুষের সার্ভেন্ট থাকবে। তারপর এখন আমরা তৈরি করছি ধনতন্ত্র। এই তন্ত্রে বলা হয়েছে কি সবাই স্বাধীন। কিছু লোক শ্রমিক, কিছু লোক পুঁজিপতি থাকবে। তার মধ্যে সকলে সমান। কিন্তু আবার সকলে সমান নয়। অদ্ভুত যুক্তি। যাঁর সম্পত্তি আছে সে, যার সম্পত্তি নাই তাকে নিজের কাজে খাটাতে পারে। তখন সে বলে যে, আপনিও একজন মজুরি শ্রমিক। তবে আপনি যদি ডাক্তার হন, তবে ইউ আর ওনলি এ হাইলি এফিশিয়েন্ট ডে ‘লেবার’। আপনার বেতনটা একটু বেশি, কিন্তু চরিত্র একই।

এই মতবাদটি অ্যাডাম স্মিথ প্রচার করলেন: ‘ধনতন্ত্রের পরে পৃথিবীতে আর কোন তন্ত্র নাই’। এটাই শেষ তন্ত্র, লাস্ট রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম। ক্যাপিটালিজম ইজ দ্যা নিউ ইসলাম অব মডার্ন টাইমস। ধনতন্ত্রই আধুনিক জমানার শেষ এসলাম। এরপর আর কোন রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম থাকতে পারে না।

এই যে মতবাদ, এনলাইটেনমেন্টও তাই। ভলতেয়ার ও দিদ্রো প্রভৃতি ফরাসি দার্শনিক বললেন, ‘আমরা যে সংস্কারে এসে উপনীত হয়েছি, সেটা পৃথিবীর শেষ সংস্কার’। মিশেল ফুকো বললেন, ‘এই কথা ঠিক নয়।’। এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটাকে আমরা কেন বেছে নেবো, এটাও যদি আগের মতই হয়? উনি বলছেন, ‘আমি যদি এয়াহুদি ধর্ম ত্যাগ করি তাহলে আমি খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করবো না কেন? আর খ্রিস্টধর্মই যদি ত্যাগ করতে পারি তবে ইসলাম ত্যাগ করবো না কেন? সুতরাং আখেরি যুক্তি, লাস্ট লজিক হচ্ছে কি আমি কোনো ধর্মেই থাকব না।

ওঁর বক্তব্য: আমি যদি সামন্তবাদ ত্যাগ করতে পারি, দাসপ্রথা ত্যাগ করতে পারি, ধনতন্ত্র ত্যাগ করতে পারি তাহলে আমি সমাজতন্ত্রে আসব না কেন? উনি আরও বলেন ‘অবশ্যই আসব, কিন্তু এত যখন ত্যাগ করলাম তাহলে সমাজতন্ত্রটা ত্যাগ করতে অসুবিধা কী?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি যাব কোথায়? আমার তো একটা লক্ষ্য দরকার’। এই হলো ক্রাইসিস এর পর্যায়।

এইখানে, এই যে আমি আপনাদের সামনে একটা গোলকধাঁধার মত অবস্থা উপস্থিত করলাম, এটাই হচ্ছে মিশেল ফুকোর সার বক্তব্য। উনি বলেছেন, ‘মানুষের কোন আলটিমেট তন্ত্র থাকতে পারে না। কোন আলটিমেট ধর্ম থাকতে পারে না’। তাহলে, আপনাকে প্রতিদিনই নিজের ধর্ম নিজে রচনা করতে হবে। প্রতিদিনই নিজের তন্ত্র নিজে রচনা করতে হবে।

এইটা বলে যদি তিনি পার পেতেন, তাহলে আমরা আর তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতাম না। কিন্তু, তিনি কিছু সমস্যা রেখে গেছেন। সেইটাই আমাদের দেখতে হবে। এখন, ‘ক্রিটিক’ বলতে তিনি কি বোঝাচ্ছেন? উনি বলছেন, ‘এলাইটেনমেন্ট মতবাদ বটে, সে অন্যের সমালোচনা শুধু করে না, সে নিজেও নিজের সমালোচনা করে’। এটা সেফ রিফ্লেকসিভ। অর্থাৎ এনলাইটেনমেন্ট বলে দিতে পারে যে এটা আমার ত্রুটি। তিনি বলছেন, ‘আমার সেই এনলাইটেনমেন্ট চাই যে নিজেই নিজের ত্রুটি দেখাতে সক্ষম’। তো, সেটা কী করে সম্ভব?

তাই তিনি বললেন, আসুন আমরা কান্টের লেখাটা পড়ি। কান্ট যেহেতু খ্রিস্টধর্মের ভিতরে বড় হয়েছেন, সেহেতু তাঁর লেখাও খ্রিস্টিয় রেফারেন্সে ভর্তি। কান্টের রেফারেন্স হলো এই, ‘মানুষ যতদিন পর্যন্ত নাবালেগ থাকে, ততদিন পর্যন্ত তাকে বাইরের থেকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যায় কেউ। মানুষ যখন সাবালেগ, প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন সে নিজে নিজেই চলতে পারে’। এয়ুরোপের পরিপ্রেক্ষিতে উনি নামটা না বললেও এটাই বোঝাচ্ছেন। খ্রিষ্টধর্মের ধর্মসভা, অরগানাইজেশন অব ক্রিশ্চিয়ান থিয়োলজি, যিশুর অনুসারির চার্চ।

আমরা চার্চ মানে দালানটা মনে করি, উনি দালানটা না বলে বলেছেন, দালানের ভেতরে যে মনোভাবটা থাকে সেটাই চার্চ। এসোসিয়েশন অব ক্রিশ্চিয়ানস। এটা অফিসিয়াল এসোসিয়েশন। সংক্ষেপে খ্রিস্টান-সমাজ। এটাই নিয়ম করেছে তুমি এটা করতে পারবা, সেইটা করতে পারবা না। এটা জায়েজ, ওইটা নাজায়েজ। ইতি আদি।

কান্টের বক্তব্য হলো, ‘যে মানুষ চার্চের হাতে আত্মসমর্পণ করেছে সে মানুষ বালেগ নয়। যে মানুষ নিজেই নিজের কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে, সেই বালেগ’। কাজেই উনি এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা দিলেন এভাবে, ‘মানুষ যখন সাবালেগ হয়, সেই যুগটাই এনলাইটেনমেন্টের যুগ। তো, সাবালেগ হবার লক্ষণ কী? সে যেমন পরের সমালোচনা করতে পারে, তেমন নিজেও নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত বা সক্ষম। এই মানুষ আলোকিত নয়, আলোকক। কোন মানুষ আলোকক? যে নিজেই নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত সেই মানুষই আলোকক, বাংলার গুণে বলা যাক আলোর মোরগ। আর সেই মানুষই হচ্ছে আলোর মুরগি যে শুদ্ধ পরের সমালোচনা করে, নিজের বিচার করতে সক্ষম নয়। অক্ষম কেবল বলে বেড়ায়, আমার বিচার তুমি কর।

এলাইনটেনমেন্ট বলতে আমাদের বুঝতে হবে আরো নানান জিনিশ, এনলাইটেনমেন্টর মধ্যে একটা পরোপকারের ভাব আছে। যেমন এয়ুরোপ থেকে এনলাইটেনমেন্টের জন্য রবার্ট ক্লাইব বা ক্রিস্টোফার কলম্বাস সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস সদা বিশ্বাস করেছেন (অলওয়েজ বিলিভড দ্যাট) তিনি একজন মিশনারি, ধর্মপথিক, তীর্থযাত্রী বা হাজি। শুদ্ধ ঈশ্বরের গুণগান কীর্তনের জন্যই আমেরিকায় গিয়েছিলেন তিনি। হি অলওয়েজ থট দ্যাট হি ওয়াজ এ রিলিজিয়াস ম্যান এন্ড দ্যাট ওয়াজ হিজ মিশন।

মগর তিনি কিতা খরলেন ভগবানের আমেরিকাখণ্ডটায়? বাট হোয়াট হি ডিড ইন দি আমেরিকাস? এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, যা করেছিলেন তার সরল পরিচয় প্রলয়, সেটা ডেভাস্টেশন। আফ্রিকা থেকে লোক ধরে দাস বানালেন তাঁরা, একরোখা কলম্বাসবাদীরা। দে ওয়ার ব্রিঙ্গিং স্ল্যাভস ফ্রম দি পপুলেশন।

তাহলে ওই আমেরিকানদের দোষটা ছিল কী? এক নম্বর দোষ তারা খ্রিষ্টান ছিলেন না। দুই নম্বরে তারা এয়ুরোপীয় ছিলেন না। এরকম দোষ আপনারা ধরতে পারেন। সেখান থেকে তারা যে ইন্ট্রিগ্রেটেড হয় নাই এজন্য তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলেছে। একটা-দুটা কাহিনী আমরা পড়ি। যেমন ‘পো-কা-হুন-টাস’। একটা আমেরিকান-ইন্ডিয়ান মেয়েকে এয়ুরোপে নিয়া আসলো। তারপর কী যেন, একটা চিড়িয়াখানার বাঘের মত সে তো শেষে মারাই গেলো।

আমি এজন্যই বলছি যে, এনলাইটেনমেন্ট বলতে চলন্ত ধারণা হলো, ‘দি ডিসকোর্স অব প্রগ্রেস, মডার্নিটি এন্ড হিয়ুম্যানিজম।’ মিশেল ফুকো বলছেন, ‘নো, এনলাইটেনমেন্ট কথাটির আরেকটি অর্থ করা যায়। এনলাইটেনমেন্ট মিনস্ দি পসিবিলিটি অব অটোক্রিটিক।’ অর্থাৎ, বিদ্যমান সবকিছুরই নিরন্তর সমালোচনা। এটা কার্ল মার্ক্সের বক্তব্য। এটা কি সম্ভব? আমি আপনাদের বোঝাতে চাচ্ছি, হোয়াট ইজ দ্যা প্রজেক্ট অব মিশেল ফুকো? আপনারা লেখাটা পড়ে দেখেন যে আমি যে সারমর্ম করলাম তার মধ্যে কী পরিমাণ বিকৃতি সাধন করলাম। আমি যা বলেছি তার মধ্যে ফুকোকে কী পরিমাণ মিস-রিপ্রেজেন্ট করেছি।

মিশেল ফুকোর কথা গ্রহণ করতে হলে উনি যেই সোর্সগুলোর নির্দেশনা দিয়েছেন তা দেখতে হবে। প্রথম সোর্স হল, ইমানুয়েল কান্টের লেখা। উনি কী বলছেন? পত্রিকায় একটা প্রশ্নের উত্তরে উনি এটা লিখেছিলেন। জার্মানির একটি পত্রিকা বার্লিনিশে মোনৎশ্রিফ্ট্, (Berlinische Monatschrift) বাংলায় করলে দাঁড়ায় ‘মাসিক বার্লিন পত্রিকা’। সেই পত্রিকা প্রশ্নে বলছে, ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু? মাননীয় দার্শনিকগণ উত্তর দিন।’

প্রথম যিনি উত্তর দিলেন তাঁর নাম ‘মোজেজ মেন্ডেলসন’। ইনি জার্মানির সবচেয়ে মশহুর এয়াহুদি দার্শনিক তখন। ইয়াহুদি হিসেবেই তিনি পরিচিত। আর এমানুয়েল কান্ট মহোদয় খ্রিস্টান দার্শনিক। এই কান্টের উত্তরটা দ্বিতীয় উত্তর। সেখানে কান্ট বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট বলতে আমরা বুঝবো, মানবসন্তান যে পর্যন্ত নিজেই নিজেকে নাবালক করে রাখে, সেই অবস্থা থেকে তার মুক্তি।’ তাহলে নাবালক অবস্থা কী জিনিশ? এটা একটা কথার রূপ বা মেটাফোর। যে মানুষ বয়সে পঁয়ত্রিশ বছর হয়েছে কিন্তু এখনো পাঁচ বছরের বাচ্চার মত কথা বলে। অর্থাৎ আমরা এয়ুরোপের অনেকদূর অগ্রগতি করেছি কিন্তু কোনো কোনো জায়গায় এখনো শিশুর মত আছি। সেই শৈশব থেকে মানব জাতির বন্ধনদশা যখন ঘোচে তখনই এলাইটেনমেন্টের উৎপত্তি হয়। এটা একরকম ভোরবেলা। যখন আলো ফোটে। আমরা বেগম রোকেয়ার ভাষায় বলতে পারি এটা ‘সুব্হে সাদেক’। এখন সকাল হল। আলো ফুটল।

আরবিতে ‘সাদেক’-এর মধ্যে যে সত্যের একটি আভাস আছে, এইখানেও এরকম একটি আভাস দেখছেন উনি। দি এনলাইটেনমেন্ট মিন্স ইউর ইমার্জেন্স টু ট্রুথ। যদিও উনি বলছেন না বাংলায় আমরা এটার নাম দিয়েছি খুব বিশ্রি, ‘প্রথম আলো’। বাংলায় এনলাইটেনমেন্টের সবচেয়ে চালু অনুবাদ কোনটা জানেন? ‘প্রথম আলো’। দিস ইজ দ্যা টাইটেল অব এ বুক বাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এন্ড হুইচ আওয়ার ফ্রেন্ডস্ আর কপিয়িং হিয়ার। তার জন্মের মধ্যে এই ত্রুটিটা আছে আরকি। এটা নকলনবিশ নাম। ‘প্রথম আলো’ মানেই সুব্হে সাদেক। ‘প্রথম আলো’ মানেই এনলাইটেনমেন্ট। এইটাকেই জার্মানরা বলে ‘আউফক্লারুঙ্গ’। আউফ মানে আপ। ক্যারুঙ্গ মানে ক্লিয়ারিং। আক্ষরিক অর্থে। অর্থাৎ ময়লাটা মুছে ফেলুন।

এই এনলাইটেনমেন্ট আসছে খ্রিস্টধর্মের বিচার বা সমালোচনা হিসেবে। সব কথা বলা যাবে না এখানে। সময় সংক্ষিপ্ত, মোখ্তসর। সেখানে স্বৈরতন্ত্র ছিল। ধর্মতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র সমার্থক। হোয়াট ওয়াজ জার্মানি এট দ্যাট টাইম? ইট ওয়াজ এ হলি রোমান এম্পায়ার। মানে পবিত্র রোম সাম্রাজ্য। ভলতেয়ার ভাঁড়সুলভ ভাষায় কয়েছেন ঐ সাম্রাজ্য না ছিল হলি, না রোমান, না এমনকি সাম্রাজ্য। তবে অবিচার ছিল, ভাগাভাগি ছিল ক্ষমতার। ওরা বলেছিল এখানে পরকালের দায়িত্ব পোপ সাহেবকে দিচ্ছি। আর ইহকালের দায়িত্ব আমরা সম্রাট সাহেবরা নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের অথরিটি আসছে ফ্রম দ্যাট, মানে ঐখান থেকে। ধর্মই আমাদের সিদ্ধির মাপকাঠি।

তার ভেতরেই চাকরি করেন দার্শনিক ‘ইমানুয়েল কান্ট’। এর মধ্যে থেকে তিনি যেটুকু বলতে পারেন, বলছেন যে, ‘সমস্ত ব্যাপারে চার্চের মাতব্বরি মেনে নেওয়া আমাদের প্রগতির পক্ষে অসুবিধা।’ প্রশ্ন হল, কী সমালোচনা করা যাবে আর কী করা যাবে না? তখন সেন্সর চালু ছিল। নিয়ম বেঁধে দিয়েছে, এইটা সমালোচনা করতে পারবেন আর এইটা সমালোচনা করতে পারবেন না। কারণ কী? এটা সেন্সিবিলিটিতে আঘাত করবে। এইভাবে আসতে আসতে কান্টের মূল সিদ্ধান্ত হল: ‘আপন যুগের, আপন ধর্মের সমালোচনা আপনাকে করতে হবে। এনলাইটেনমেন্ট মাস্ট পারমিট ক্রিটিসিজম অব রিলিজিয়ন।’

কান্টের এই কথার সূত্র ধরেই মিশেল ফুকোও যোগ করলেন আপনকার এক ফোঁটা নবীন শিশির । উনি বললেন, ‘তাহলে ইস্! উই ক্যান ক্রিটিসাইজ এনলাটেনমেন্ট ইটসেল্ফ।’ দার্শনিক যুক্তি হিসেবে এমন মহা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোন জিনিসের মূল্য নির্ভর করে তার মৌলিক উত্তরের উপর শুধু নয়। তার সমসাময়িকতার উপরও। কোন সময়ে কোন জায়গায় কে কী বলছেন, সেটাই দরকারি হয়ে ওঠে।

মিশেল ফুকো বলছেন, ‘এখন এয়ুরোপে যে ধনতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে তার আধ্যাত্মিক আদর্শ এনলাইটেনমেন্ট। এই এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে আমরা হয়ত এই ধনতন্ত্রকে অতিক্রম করতে পারবো না, কাজেই আমাদের এইটার সমালোচনা করার মত একটা সূত্রও বের করতে হবে। নাম তিনি দিয়েছেন ‘ক্রিটিক’। ‘ক্রিটিক’ কথাটা এয়ুরোপে প্রথম প্রমিনেন্ট করেছেন ইমানুয়েল কান্ট। ‘ক্রিটিক’ মানে সমালোচক নয়, সমালোচনার ধর্ম। অনেকে এই ‘ক্রিটিক’-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন ‘সম-আলোচনী’। ক্রিটিক মিনস্ এ ডিসকোর্স হুইচ কন্টেইনস ক্রিটিসিজম। কন্টেইন শব্দে যেমন ধারণ করা বোঝায়, আবার রোধ করাও বোঝায়। এ তলোয়ার দুধারি।

‘ডিসকোর্স’ কথাটার অর্থ আমরা পরিষ্কার বুঝি কিনা বোঝা দরকার। আমি নিজেও বুঝতাম না। আনটিল আই কেইম এক্রস দি রাইটিংস্ অব জাক লাকাঁ। জাক লাকাঁর মধ্যে ডিসকোর্স কথাটা কোন অর্থে আসছে? ডিসকোর্সের যদি আক্ষরিক অর্থ করেন, ইট ইজ এ কোর্স অব স্পিচ্। এখন এর একটা নতুন বাংলা আমি প্রস্তাব করেছি। আপনারা হয়ত এখনো শোনেন নাই। এই ডিসকোর্সের বাংলা ‘সন্ধ্যা’।

আপনারা সান্ধ্য আইনের কথা শুনেছেন, কিন্তু ‘সন্ধ্যাভাষা’র কথা হয়ত এখনো শোনেন নাই। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। সন্ধ্যাভাষা বলে কোনটাকে? চর্যাপদের ভাষা এক ধরনের সন্ধ্যাভাষা। আমরা যে অর্থ নিয়েছি এর তা কি জানেন? মধ্যযুগ বলে একটা জায়গা আছে। তার সঙ্গে আছে অমধ্যযুগ। দুইয়ের একটা সন্ধিস্থল থাকবেই।

কিন্তু চর্যাপদ কোন সময়ে লেখা? বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধধর্মের প্রচার তুঙ্গে উঠেছে, এটা মূলত হযরত গৌতম বুদ্ধের অনেক পরে। তাঁর এক হাজার দেড় হাজার বছর পরে বঙ্গীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধরা তাঁদের গান (প্রার্থনা সঙ্গীত) যে ভাষায় করছেন সেইগুলিকে আমরা সন্ধ্যাভাষার নমুনা বলি এখন। এখনও দাবি করি এসব বাংলা। হরপ্রসাদ দাবি করলেন এগুলো হাজার বছরের পুরানা বাংলা। কে জানে এগুলো কি বাংলা, না বাংলা নয়? হিন্দিওয়ালারা বলেন হিন্দি। উড়িয়ারা বলেন উড়িয়া। অহমিয়ারা বলেন অহমিয়া। আমরা বলি বাংলা। কিছু আসে যায় না। এসব ব্রজের ভাষার মত বা মিথিলার ভাষার মত।

এখন সন্ধ্যাভাষা কোন সমাজের বৈশিষ্ট্য? শহীদুল্লাহ সাহেবের থিওরি যদি সত্য হয় তবে, সপ্তম থেকে একাদশ-এর মধ্যে হয়েছে এটা। খ্রিস্টিয় শতাব্দী অনুসারে আজ থেকে চোদ্দশ তেরোশ বারোশ বছর আগে। আসলে কিন্তু আমরা ওই সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিও না। আমি সেই অর্থে সন্ধ্যা ব্যবহার করি নাই। সন্ধ্যা মানে হেঁয়ালিও নয় ।

দিবা ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ, সেইখান থেকে সন্ধ্যা কথাটা আসছে। সন্ধি মানে চুক্তি, যুদ্ধে যেমন সন্ধি হয়। সন্ধি মানে এক অর্থে মিলন। কিন্তু এই মিলন আবার এক অর্থে যুদ্ধচিহ্নিত। সন্ধ্যাভাষায় তাহলে কার সাথে কার চুক্তি?

ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ এ ভেক্টর। রাশি বলি দুই ধরনের। স্কেলার রাশি আর ভেক্টর রাশি। ভেক্টর মানে যেখানে ডিরেকশন্ থাকে। আমি আপনার উদ্দেশে বলছি, আপনি আমার উদ্দেশে বলছেন। এই ভেক্টর যেখানেই থাকে সেখানেই সন্ধির উৎপত্তি হয়। ইট ইজ দি ভেক্টর অব সাবজেক্ট। হুইচ ট্রাইস টু মেক এ লিঙ্ক উইথ দ্যা ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি যখন দাঁড়িয়ে এখানে বক্তৃতা দিচ্ছি আপনারা বলছেন সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু আমি যে বক্তৃতা দিচ্ছি সে আর আমার ‘আমি’ কিন্তু এক নয়। আমার একটা ‘সহ-জ’ আছে, যে আমার সঙ্গে জন্মেছে। বক্তৃতা আমি দিচ্ছি। কিন্তু আবার আমার সহজও দিচ্ছে। যুগপৎ। কখনও আমি দিচ্ছি। এ বক্তৃতা খালি। কখনও সে (সহজ) আর আমি দিচ্ছি। এটা ভরা।

আমরা ডিসকোর্স বলি সেই ভাষাকেই যে ভাষা ডিরেকশন বা দিক গ্রহণ করেছে। এইজন্য বলি মাস্টারস ডিসকোর্স, স্লেভস ডিসকোর্স, উমেনস ডিসকোর্স, ইতি আদি। স্পিচ, ল্যাঙ্গুয়েজ, ডিসকোর্স তিনেই এক জিনিস বুঝায়। কিন্তু আলাদা তারা। সবগুলিরই বাংলা করতে পারেন ‘ভাষা’। স্পিচ বলতে আমরা বলি ‘বাক্’। যথা মানুষ বাক্শক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষের স্পিচ পাওয়ার আছে। আবার বলছি কি মানুষ কী ভাষার মধ্যে বাস করে। ম্যান লিভস ইন ল্যাঙ্গুয়েজ। এখন নতুন কথা হিসেবে বলছি কী?

মানুষ যেভাবে কথা বলে সেটা কোনো না কোনো ডিসকোর্সে বিভক্ত। ইন্সটিটিউটের মধ্যে যেমন ডিপার্টমেন্ট থাকে, তেমনি ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ ডিভাইডেড ইনটু ডিসকোর্সেস।

এখন ডিসকোর্সের নিকটতম তুলনা কী? সেন্টেনস্। আপনি একটা শব্দ দেন। কোন এক অর্থ বহন করবে। যদি শব্দটা কোন বাক্যের মধ্যে বলেন তবে আরেকটা অর্থ গ্রহণ করবে। যদি বাক্যটা কোন প্যারাগ্রাফ বা এসের অংশ হয় তবে আরেকটা অর্থ হবে। আপনার গোটা বক্তৃতাটাকে আমরা ডিসকোর্স বলি। এইজন্যই আমি বলছি, সন্ধ্যা কথাটা আমরা আনছি ওই জায়গায় থেকেই। সন্ধ্যা সন্ধির ভাষা বটে। সন্ধিটা কার সাথে? সহজের সঙ্গে ভাষার সন্ধি। ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে আমি নিজেকে প্রকাশ করেও করি না। কিন্তু আমি ছুটতে থাকি ল্যাঙ্গুয়েজের পেছনে। এই ছোটার মধ্যেই আমি। আমার সহজ জন্মায় এই ছোটার টানে।

এই জন্য প্রভুদের ভাষা সন্ধ্যা নামে খ্যাত হয়। মানে আমরা যাঁদের বৌদ্ধধর্মগুরু বলি বা যাঁদের বলি সিদ্ধাচার্য তাঁদের ভাষার মধ্যে যে একটা আলো-আঁধারির ভাব আছে তা সন্ধ্যা নামে খ্যাতি পায়।

এখন আমি অনুবাদ করবো সহজ (Subject) ও সন্ধ্যা (Discourse)। ইংরেজিতে ‘সহজ’কে বলেছি সাবজেক্ট, আর ‘সন্ধ্যা’কে ডিসকোর্স। তাহলে সাবজেক্ট এন্ড ডিসকোর্স, তাদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। এইজন্য আমি এটার নাম প্রস্তাব করেছি ‘সন্ধ্যাভাষা’। সন্ধির ভাষা। জানতে হবে, সন্ধির দুইপক্ষ কে কে। দি স্পিকার ইজ স্পিকিং টু সামবডি। প্রভু দাসের উদ্দেশে কিছু বলছেন। স্বামী স্ত্রীর উদ্দেশে, ছাত্র শিক্ষকের উদ্দেশে বলছে। জাক লাকাঁ তাঁর ডিসকোর্সে চারটা ডিসকোর্সের কথা বলেছেন। দি মাস্টারস ডিসকোর্স বা সেয়ানার সন্ধ্যা। এইক্রমে ইনভার্সিটি ডিসকোর্স। দি এনালিস্টস ডিসকোর্স এবং শেষ তক দি এনালিসেন্ডস বা হিস্টেরিক্স্ বা বোকাচোদার ডিসকোর্স। নামটা বসেছে সেয়ানের জায়গায় যে বসেছে তার নামে।

আমার শেষ মন্তব্য এনলাইটেনমেন্ট বোঝার সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ‘হুজ ডিসকোর্স ইজ এনলাইটেনমেন্ট?’ কে বলছে? সেয়ানা কে এখানে?

আগে লোকে বলেছে, ঈশ্বর মানুষের কাছে যখন ওহি পাঠান তখন ঈশ্বর বলছেন বহুবচনে আমরা এটা করেছি, আমরা ওটা করেছি। ল্যাঙ্গুয়েজটা খেয়াল করবেন। এখন মানুষ যখন মানুষের উদ্দেশে বাণী পাঠায় এবং কোনো কোনো সময় ঈশ্বরের জায়গা নিজে দখল করে বলে কি, ‘আমি মানুষ, কিন্তু আমি সেয়ানা, তোমাকে ঈশ্বরের জায়গা থেকে আদেশ করছি’। সেইটা কিন্তু ওই ঈশ্বরের ডিসকোর্স গ্রহণ করে।

এই জন্য মিশেল ফুকোর নতুন কথা হল, ‘মানুষ কথাটা অর্বাচীন কথা। মানুষ শব্দটার বয়স এই মাত্র দুইশ বছর।’ আপনারা সকলেই তার প্রতিবাদ করতে পারেন। কারণ, মানুষ শব্দটা আমরা বহুদিন আগ থেকে – হযরত আদমের সময় থেকে দেখছি। আমরা সব ভাষায় দেখতেছি ‘ইনসান’ কথাটা, ‘হিয়ুম্যান’ শব্দটা আছে। কিন্তু মিশেল ফুকোর কথা অন্য। মানুষের অহমটা, অহংকারের হুংকারটা নতুন।

এই বিখ্যাত বইয়ের শেষ বাক্যে মিশেল ফুকো বলছেন, “সবকিছুর কেন্দ্রে বসা মানুষ’ কথাটা মানুষই লিখেছে। ওটা বেশি দিন টিকবে না। সমুদ্রতীরে, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে।” সমুদ্রের কাছে গিয়ে লোকে মাটিতে বসে বালিতে নিজের নাম লেখে না? জোয়ার আসলে আবার মুছে যায়। তাহলে মানুষ শব্দটা মানুষ লিখেছে এইরকম, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে। বাক্যটা খুব স্মরণীয়।

ফুকো ক্লাসিকাল আর মডার্ন এজ বলতে কী বোঝাচ্ছেন? ফুকোর কাছে নাইনটিনথ সেঞ্চুরি মানে আঠারো শ সন থেকেই মডার্ন যুগের শুরু। আর আগের যুগটাকে – মানে এর আগের দেড়শ বছরকে – তিনি বলেন ক্লাসিকাল বা বুনিয়াদী যুগ। মানে ১৬৫০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত এই সময়টাই ফুকোর অভিধানে ক্লাসিকাল যুগ আর ১৮০০ থেকে আজ পর্যন্ত বাকিটা মডার্ন যুগ।

এখানেই ফুকো বলেছেন, খেয়াল করবেন, ‘ওয়ান ক্যান সার্টেইনলি ওয়েজার (Wager – এর অর্থ বাজি ধরা, রেসের ঘোড়ার মানুষ যে বাজি ধরে, কোন ঘোড়া ফার্স্ট হবে? এইটা হল সেই বাজি ধরা) দ্যাট ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি।’ আপনি বাজি ধরতে পারেন, মানুষের দিন শেষ হয়ে গেছে। এই জন্য তিনি ফরাসিদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট হিসেবে। ফ্রান্সে কয়েকজন দার্শনিককে এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট বলা হয়েছে সেই সময়। একজন ফুকো। আরজন লুই আলথুসার। আরেকজন জাক লাকাঁ।

foucault7.jpg
মিশেল ফুকো

এরা কেন মানববিরোধী? আমরা মানববিরোধী থেকে অনুবাদ করে বলেছি মানববিদ্বেষী। ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি। ক্লাসিকাল যুগের চিন্তা মানে দেকার্ত থেকে শুরু করে কান্ট পর্যন্ত সময়টা। তার ভেতরে এনলাইটেনমেন্টও আছে।

তার পরেই শুদ্ধ মানব বা ম্যান আইডিয়াটা চলেছে এয়ুরোপে। সেটাও এতদিনে ধ্বংসের মুখে এসেছে, চলে যাবে। এটাই ছিল তাঁর প্রজেক্ট। মিশেল ফুকোর প্রকল্প এন্টি-হিয়ুম্যানিজম। কিন্তু লোকটি কেন এনলাইটেনমেন্টে আবার ফিরে আসলেন? এটা বোঝার জন্য আপনারা যদি শুদ্ধ একটা ক্লু লাভ করতে চান আমি এটা বলেই শেষ করছি, ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পড়ে দেখলেই তা পাবেন বলে।

মিশেল ফুকো কেন ইরানের বিপ্লবকে প্রথমে সমর্থন করেছিলেন এবং কেন পরে সমর্থন করতে পারেন নাই, কেন পরে তা প্রত্যাহার করলেন, সেই রহস্যের চাবিকাঠি সেখানে আছে বলে আমার বিশ্বাস। মিশেল ফুকো : পাঠ ও বিবেচনা নামের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত একটা সামান্য প্রবন্ধে আমি এই বিষয়টা বলতে চেয়েছি। (খান ২০০৭/ক)

প্রশ্নোত্তর

(দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রশ্নগুলো রেকর্ড হয় নাই। কাজেই এখানে প্রশ্নকর্তাদের বেনামিতে শুকরিয়া জানাচ্ছি।)

১ নং উত্তর
ডিসকোর্সের মধ্যে কোন জিনিসটা উপস্থিত? ডিসকোর্স মানে ল্যাঙ্গুয়েজ উইথ এ সাবজেক্ট। এখন সাবজেক্ট কথাটায় যদি আপনার অসুবিধা হয় তবে আপনি বলেন ‘এ স্পিকার’ কিন্তু এটা সত্য নয়। এটা তার প্রথম বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: ডিসকোর্সের মধ্যে একজন বক্তা থাকে। বক্তা কোন দিকে যাচ্ছে সেই দিকে একটা তীর থাকে। কাজেই এটা একটা ভেক্টর। ইট ইজ এ ভেক্টর অব স্পিচ। আপনি কোর্স কথাটা খেয়াল করছেন? এককোর্সের ডিনার বলেন না? আরো বহু রকমের কথা আছে।

আপনারা একটা সুন্দর অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেন না? যেটার নাম ‘ইন্টারকোর্স’? রতিক্রিয়ার চেয়ে কতই না সুন্দর পদটা! মিল আছে তো এখানেও। ডিসকোর্স আর ইন্টারকোর্স ইজ নট ফার ফ্রম ইচ আদার। ডিসকোর্স ইজ এ কাইন্ড অব ইন্টারকোর্স, বাই দ্যা ওয়ে। কথাও এক প্রকার সঙ্গম, সন্ধি। এটাই আমি ভদ্রভাবে বললাম, ইট ইজ এ ভেক্টর। ডিসকোর্স ইজ ইন্টারকোর্স। দেয়ার ক্যান্ট বি ওয়ান ডিসকোর্স অ্যালোন। এইটার অন্য আরেকটা নাম আছে। ‘ওনানীয়ি’ জার্মানিতে বলে। ইংরেজিতে বলে ওনানিজম। যেটার সহজ বাংলা হল স্বমেহন। আত্মমৈথুন। যেখানে ইয়ু আর দি লাভ অবজেক্ট অব ইয়োরসেল্ফ। আপনি নিজেই নিজেকে ভালোবাসেন। একা একা দাবা খেলা যায় হয়তো। বেশি একা কথা বললে অন্যে পাগল ভাববে।

আমার নতুন কথা হল, ডিসকোর্স ইজ এ ফ্যাক্ট বিটুইন সাবজেক্ট এণ্ড ল্যাঙ্গুয়েজ। ল্যাঙ্গুয়েজ কেন? কারণ ইট ইজ ফ্রম ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যালোন দ্যাট স্পিচ কাম্স্। লোকে যখন বলে আমি বলি।

আই থিংক দেয়ার ফোর আই অ্যাম। দেকার্তের প্রধান কুসংস্কার এই। মানে এয়ুরোপের লড়াইটা হচ্ছে এখানে, মানুষ মনে করে কি আমি আমার স্পিচের মালিক। এটা একটা ইলিয়ুশন। এই ইলিয়ুশনের উপরে এন্টায়ার এয়ুরোপীয় ফিলোসফি দাঁড়িয়ে আছে গত সাড়ে তিনশো বছর। এন্ড দিস ইজ দ্যা ফান্ডামেন্টাল ডিসকভারী অব দি লাস্ট ফিফটি ইয়ারস।

১৯৫০ এর পরে এয়ুরোপে যে দার্শনিক আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর: ম্যান ইজ নো লংগার মাস্টার অব হিজ ওউন হাউজ। মানুষ তার আপন বাড়ির প্রভু নয়। কথাটা ফ্রয়েডের। মিশেল ফুকো এ কথাটা পুরা তামিল করেন নাই। তিনি বলেন এনলাইটেনমেন্ট এলাউস সেল্ফক্রিটিক, অটোক্রিটিক।

ফুকো কিন্তু এই লেসন আত্মস্থই করতে পারেন নাই। সেটা আমি পরে [আরেক দিনের বক্তৃতায়] দেখাবো। অন্য কোন দিন দেখাবো। ইরানের বিপ্লবে তাঁর মনের যে দ্বিভঙ্গি ধরা পড়েছে, সেটা কিন্তু ফিলোসফির এই ত্রুটি থেকেই। এই দ্বিভঙ্গিটা আপনি জাক লাকাঁর মধ্যে দেখবেন না। অন্ধকার রাত্রে সব গাভি কালো দেখায়। সেজন্য আপনার মনে হতেই পারে জাক লাকাঁ যা মিশেল ফুকোও তা এখন। দুইজনেই ফরাসি ভদ্রলোকমাত্র। কিন্তু পরে যখন আপনারা আরো এগুতে রাজি হবেন আমি দেখাবো যে এই দুজনের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য মেটেরিয়াল, রিয়েল, মানে অখিল পার্থক্য।

প্রথম কথা, মিশেল ফুকো হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক কিন্তু তিনি এনলাইটেনমেন্টকে সংশোধন করে গ্রহণ করতে চান। জাঁক লাকাঁ দুইটাকেই বর্জন করতে চান। জাক লাকাঁ আধুনিক বিজ্ঞানকেই বর্জন করতে চান। তাহলে বিজ্ঞানের জায়গায় কী জিনিস আমি স্থাপন করবো? সেটাকেও কি আমি বিজ্ঞান বলবো? লাকাঁ বলেন সেটাকে বিজ্ঞান না বলাই ভালো। ওটাকে ডিসকোর্স বলবো।

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচাইতে বড় ত্রুটি এই: সে নিজেই মনে করে মেটা-ডিসকোর্স। মানে মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ। তার কোনো ডিরেকশানলিটি নাই। সে স্বয়ম্ভু। সে প্রভুর মত। শ্রেণীস্বার্থ গোষ্ঠীস্বার্থ কোনো কিছুই তার জন্যে মেটার করে না। পয়েন্ট অব ভিউ জিনিসটাকে সে অস্বীকার করতে চায়।

আমরা অনেক সময় মনে করি কি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষ র‌্যাশনাল প্রাণী। এই কথাটার মধ্যে বিরাট আকারের একটা ফাঁকি আছে। যদি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন না হতো তাহলে আমরা আর কোন কথা বলতাম না। কিন্তু মানুষ যে যুক্তিনিষ্ঠ, র‌্যাশনাল যে বলা হয়, এর অর্থ কী?

মানুষের সকল কর্মকাণ্ড মানুষ নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে না। সে যেন কোথা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। কার্ল মার্ক্স এক জায়গায়, মোতাবেক ‘কুয়াশা মাসের আঠার তারিখ’ নামক এক কেতাবের ফাতেহায়, বলছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাস নির্মাণ করে বটে, তবে সে ইতিহাস যাচ্ছেতাই নয়। অতীত থেকে আসা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তাকে ইতিহাস নির্মাণ করতে হয়। তাকে কতগুলো অবস্থা ভাগ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। তারপরে গিভেন মেটেরিয়েল দিয়ে সে ইতিহাস নির্মাণ করতে পারলে পারে, না হলে পারে না।’ এটারই প্রতিধ্বনি আমরা পাবো আধুনিক কালে। মানুষের ভাষা প্রমাণ করে যে, মানুষ ভাষারই ক্রীড়নক, বেশ কিছু পরিমাণে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

ফুকো যে মোটের ওপর অর্ধশিক্ষিত দার্শনিক তার প্রমাণ এই যে, তিনি এখানেই তাঁর বই শেষ করেছেন। জাক লাকাঁ কিন্তু ঐখানেই কথা শেষ করেন নাই। জাক লাকাঁ তাঁর চেয়ে অন্তত এক আনা ঢের শিক্ষিত। উনি বললেন, বাট রিমেম্বার মাই ফ্রেন্ড, ম্যান স্টিল স্পিকস। অ্যাণ্ড অ্যাটেম্পট্স্ টু এসকেপ ফ্রম দি আদার। কিন্তু পারে না। একপক্ষে কখনো সন্ধি হয় না। ভাষাই যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো তাহলে সাবজেক্টিভিটির কোন মূল্য থাকতো না।

আমি সংক্ষেপে বলি, জাক দেরিদার যে ত্রুটি আমি একটা ছোট প্রবন্ধে দেখিয়েছি, ভবিষ্যতে ইনশাল্লাহ আরো দেখানোর ইচ্ছে আছে। জাক দেরিদা ইজ নট মাচ ডিফারেন্ট ফ্রম জর্জ বুশ। অনলি ডিফারেন্স ইজ; হি ইজ এ ফিলোসফার এন্ড দ্যাট ম্যান ইজ এ প্রেসিডেন্ট। একজন বৃত্ত আরেকজন দুর্বত্ত। (খান ২০০৭/খ)

এতদিন যাবৎ আমরা মিশেল ফুকো ও জাক দেরিদাকে কিছুটা ভক্তি দেখিয়েছিলাম। দে আর ক্রিটিকস্ অব এয়ুরোপিয়ান মেটাফিজিকস্, ক্রিটিকস অব এয়ুরোপিয়ান লিবারেলিজম। কিন্তু যখন অখিল আপন জায়গায় আসে, তখন ধরা যায় তাঁদের ভেক ভেকমাত্র।

২ নং উত্তর
মিশেল ফুকো পড়ার জন্য আপনাদের আমি এন্টিডোট হিসেবে দুইটা জিনিস তুলনা করতে বলি। এক: আপনারা মিশেল ফুকোর সমস্ত লেখার সাথে মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি লেখা পড়েন। এটা একটা মাপকাঠি। তাঁর আট দশটা বই আছে, সবগুলো পড়তে হবে। এটা হল আমাদের লংটার্ম সিলেবাস। আর দুই: মিশেল ফুকোকে তাঁর আদার কন্টেমপোরারির সাথে তুলনা করে দেখতে হবে। এর মধ্যে আছেন দেরিদা এবং লাকাঁ। আরো অনেকে আছেন। আমি আপাতত মাত্র এই দুইজনেরই নাম নিচ্ছি।

আমি এই কথা বলবো যে, মিশেল ফুকো লিবারেল কি ইল্লিবারেল সেটার বাইরেও বড় কথা মিশেল ফুকো একজন ভালো লেখক এবং তাঁর কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। বড় শিক্ষকেরা, বড় লেখকেরা যখন ভুলও করেন তখন তাঁরা অনেক ছোট ছোট চেরাগ রেখে যান। সেগুলো থেকে আমাদের শেখার আছে। আমি এইজন্য মনে করেছি মিশেল ফুকোকে আমাদের পাঠ্যসূচির প্রধান ক্যান্ডিডেট হিসেবে।

৩ নং উত্তর
আপনারা জানেন মিশেল ফুকো কম বয়সে দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘পাগলামির ইতিহাস’। আরেকটা ‘হাসপাতালের ইতিহাস’। ‘ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন’এবং ‘বার্থ অব দি ক্লিনিক’। ‘অর্ডার অব থিংস’ তাঁর তৃতীয় বই। আর ওঁর চতুর্থ বই ‘আরকিওলজি অব নলেজ’। তৃতীয় আর চতুর্থ বই দুটা আসলে একই বইয়েরই দুই খণ্ডমাত্র।

এরপরে তিনি দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’। এটা ‘জেলখানার ইতিহাস’। তারপর সর্বশেষ যেটাকে আমরা বলি ‘রতির ইতিহাস’। ‘হিস্ট্রি অব সেক্সচুয়ালিটি’। রতির ইতিহাস লিখার পর তিনি বিরতি দিলেন।

৪ নং উত্তর
লুই আলথুসার বলছেন, হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। দেয়ার ইজ নো সাবজেক্ট। এখন আমি এ বাক্য ফুকোতে এট্রিবিউট করছি না, তবে ইট ওয়াজ অলসো ফুকোস ভারচুয়াল পজিশন। অর্থাৎ হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। উনি সাবজেক্ট বলে কিছু স্বীকার করেন না। আমি বলছি লাকাঁ ফ্রম দি ভেরি বিগিনিং এডমিটেড দি এক্সিসটেন্স অব দি সাবজেক্ট। পার্থক্যের মধ্যে এই।

(এপ্রিল ২০০৭)


দোহাই

১. সলিমুল্লাহ খান, ‘ইরান ও ইসলাম: মিশেল ফুকো বোধিনী,’ পারভেজ হোসেন সম্পাদিত, মিশেল ফুকো: পাঠ ও বিবেচনা, ঢাকা: সংবেদ ২০০৭/ক।

২. সলিমুল্লাহ খান, সত্য সাদ্দাম হোসেন ও স্রাজেরদৌলা, ঢাকা: এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৭/খ।

৩. Arthur C. Danto, ‘Interview’ in Ewa Domanskka, Encounters: Philosophy of History after Postmodernism, Charlottesville: University of Virginia Press, 1998.

১৫ নভেম্বর ২০০৭, বিডি নিউজ
(স্বাধীনতা ব্যবসায় গ্রন্থে পরিমার্জিত পুনর্মুদ্রণ প্রকাশ পাইয়াছে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *